নিজামুদ্দিন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন—বিএনপি ক্ষমতায় না এলে তিনি ভাত খাবেন না। টানা ১১ বছর ৫ মাস ১৫ দিন সেই প্রতিজ্ঞায় অটল ছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার ভোররাতে সংসার, রাজনীতি ও জীবনের সব মায়া ত্যাগ করে ৬৫ বছর বয়সে চিরবিদায় নিলেন নিজামুদ্দিন। তিনি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার বাঁশবাড়িয়া গ্রামের মৃত নুর আলী বক্সের ছেলে।
জীবদ্দশায় নিজামুদ্দিন ছিলেন একজন একনিষ্ঠ বিএনপি কর্মী। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভাত না খাওয়ার অদ্ভুত কিন্তু দৃঢ় সংকল্পে জীবনযাপন করা এই মানুষটি বিএনপির প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন। জীবনের শেষ ইচ্ছাগুলো অপূর্ণ রেখেই তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেন।
জীবিত অবস্থায় নিজামুদ্দিন বারবার বলতেন,
“আমি প্রতিজ্ঞা করেছি—আমার তারেক জিয়া যেদিন দেশে ফিরবেন এবং বিএনপি যেদিন ক্ষমতায় আসবে, সেদিনই আমি ভাত খাব। তার আগে নয়। এতে জীবন চলে গেলেও আমার কোনো আফসোস নেই।”
নির্মম পরিহাস হলো, তারেক রহমান দেশে ফিরলেও বিএনপি এখনো ক্ষমতায় আসেনি। সেই অপেক্ষার মধ্যেই নিভে গেল নিজামুদ্দিনের জীবনপ্রদীপ। প্রিয় নেতার সঙ্গে একবার দেখা করা কিংবা এক টেবিলে বসে ভাত খাওয়ার স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে মহেশপুরে বিএনপির একটি দোয়া মাহফিলে রান্নার দায়িত্বে ছিলেন নিজামুদ্দিন। ওই সময় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মী সেখানে এসে রান্না করা খিচুড়ির হাঁড়িতে লাথি মেরে উল্টে দেন। এই ঘটনায় চরমভাবে অপমানিত হয়ে সেদিনই নিজামুদ্দিন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন—বিএনপি ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত তিনি আর ভাত খাবেন না। এরপর থেকে তিনি ভাত ছুঁয়েও দেখেননি।
অনেকে তাকে ভাত খাওয়ানোর চেষ্টা করেছেন, অনুরোধ করেছেন, অর্থ সহায়তা দিতে চেয়েছেন। কিন্তু কোনো কিছুতেই তিনি নতি স্বীকার করেননি।
পেশায় কাঠমিস্ত্রি নিজামুদ্দিন নিজের পরিশ্রমের আয়েই জীবন চালাতেন। তিনি নিয়মিত স্থানীয় বিএনপি কার্যালয়ে যেতেন, শহীদ জিয়াউর রহমান ও তারেক রহমানের ছবি পরিষ্কার করতেন। তার ভাষায়,
“দলই আমার পরিবার, জিয়া পরিবারই আমার প্রেরণা। টাকায় আমাকে কেনা যাবে না।”
নিজামুদ্দিনের স্বপ্ন ছিল—বিএনপি ক্ষমতায় এলে একটি ছাগল জবাই করে গ্রামবাসীকে ভাত খাওয়াবেন এবং তারেক জিয়ার সঙ্গে এক টেবিলে বসে খাবেন।
২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে বিষয়টি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নজরে আসে। তার নির্দেশনায় নিজামুদ্দিনকে ফরিদপুর ও ঢাকায় উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিছুটা সুস্থ হয়ে গ্রামে ফিরলেও তিনি আর পুরোপুরি সেরে উঠতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার রাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
তার মৃত্যুতে বাঁশবাড়িয়া গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। রাজনৈতিক নেতাকর্মী, আত্মীয়স্বজন ও সাধারণ মানুষ তার বাড়িতে ভিড় করছেন। অনেকেই তাকে রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞার এক জীবন্ত প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করছেন।
নেতৃবৃন্দ নিজামুদ্দিনের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বলেছেন, তার পরিবারের পাশে উপজেলা বিএনপি থাকবে।
পেশায় কাঠমিস্ত্রি নিজামুদ্দিনের মৃত্যু শুধু একটি জীবনের অবসান নয়—এটি একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞারও পরিসমাপ্তি।