বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডিজিটাল ক্যামেরার নাম লিগ্যাসি সার্ভে অব স্পেস অ্যান্ড টাইম (Legacy Survey of Space and Time-LSST)। ক্যামেরা এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি এক যুগান্তকারী সৃষ্টি। দুই দশকের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী এই ক্যামেরাটি নির্মিত হয়েছিল।
অবস্থান ও স্থাপনা :
এলএসএসটি ক্যামেরাটি স্থাপন করা হয়েছে ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরিতে।
অবস্থান : চিলির উত্তরাঞ্চলে আন্দিজ পর্বতমালায় অবস্থিত সেরো পাচোন-এর এল পেনন চূড়া (উচ্চতা প্রায় ২৭৩৭ মিটার)।
টেলিস্কোপ : ক্যামেরাটি অবজারভেটরির সিমোনি সার্ভে টেলিস্কোপ-এ মাউন্ট করা হয়েছে। এই অবজারভেটরিটি এখন যে ১০ বছরব্যাপী মহাকাশ জরিপ চালাবে, তার নামও হলো ‘Legacy Survey of Space and Time (LSST)’।
ক্যামেরাটির উপাদান ও গঠনগত বিবরণ :
এলএসএসটি ক্যামেরাটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের জন্য নির্মিত বৃহত্তম ডিজিটাল ক্যামেরা। এর মূল উপাদানগুলো হলো :
১. ফোকাল প্লেন অ্যারে :
ক্যামেরাটির মূল মেকানিজম হলো এর ফোকাল প্লেন।
পিক্সেল সংখ্যা : ৩২০০ মেগাপিক্সেল।
সেন্সর : এতে ১৮৯টি হাই-পারফরম্যান্স চার্জ-কাপল্ড ডিভাইস (CCD) সেন্সর রয়েছে। প্রতিটি সেন্সর হলো 4K\times 4K আকারের।
গঠন : এই সেন্সরগুলো ছোট ছোট ‘রাফট’ (Raft) নামে 3\times 3 অ্যারেতে সাজানো হয়েছে। প্রতিটি রাফট নিজেই একটি ১৪৪ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা হিসেবে কাজ করে।
কার্যকারিতা : ফোকাল প্লেনটি প্রায় -১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ঠাণ্ডা রাখা হয়, যাতে ছবির ‘নয়েজ’ বা ত্রুটি কম হয়। মাত্র ২ সেকেন্ডের মধ্যে পুরো অ্যারের ডেটা রিডআউট করা সম্ভব।
২. লেন্সের বিবরণ :
এই ক্যামেরায় তিনটি রিফ্র্যাক্টিভ লেন্স ব্যবহার করা হয়েছে, যা মহাবিশ্বের আলো সংগ্রহ করে সেন্সরে ফোকাস করে।
মোট লেন্স : ৩টি (L1, L2 এবং L3)।
কাজ : লেন্সগুলো ফোকাল প্লেন অ্যারের ওপর আলোকরশ্মি ফোকাস করে, যার ফলে ৯.৬ বর্গ ডিগ্রির একটি বিশাল ক্ষেত্রফল একবারে ক্যাপচার করা সম্ভব হয় (যা আকাশে পূর্ণিমার চাঁদের আকারের ৪০ গুণেরও বেশি)।
৩. ফিল্টার ব্যবস্থা :
ক্যামেরাটিতে ৬টি ভিন্ন স্পেকট্রাল ব্যান্ডে (u, g, r, i, z, y) আলো ধরার জন্য বড় অপটিক্যাল ফিল্টার রয়েছে।
ফিল্টার : পাঁচটি (u, g, r, i, z, y-এর মধ্যে যেকোনো পাঁচটি) ফিল্টার একটি ক্যারোসেল-এ সংরক্ষণ করা থাকে, যা পর্যবেক্ষণের সময় ১-২ মিনিটেরও কম সময়ে পরিবর্তন করা যায়।
সাইজ : প্রতিটি ফিল্টার প্রায় ৭৫ সেন্টিমিটার ব্যাসের এবং ৪০ কিলোগ্রাম ওজনের
আবিষ্কার এবং নির্মাণের সময় :
এলএসএসটি ক্যামেরাটি কোনো একক আবিষ্কারকের কাজ নয়। এটি বহু-প্রতিষ্ঠানিক সহযোগিতার ফসল।
নির্মাণের নেতৃত্ব : এই ক্যামেরাটির নির্মাণকাজে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ডিপার্টমেন্টের (DOE) এসএলএসি ন্যাশনাল অ্যাকসেলারেটর ল্যাবরেটরি (SLAC National Accelerator Laboratory) এবং এর সঙ্গে বহু সহযোগী প্রতিষ্ঠান।
প্রাথমিক ধারণা : ক্যালিফোর্নিয়ার কিপ্যাক অধ্যাপক স্টিভ কান ক্যামেরাটির ধারণাগত নকশার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
অর্থায়ন : ইউএস ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন এবং ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ এনার্জি যৌথভাবে এই প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে।
নির্মাণের সময় কাল :
ধারণা : এই অবজারভেটরি প্রকল্পের ধারণাটি প্রথম প্রস্তাব করা হয় ২০০১ সালে।
নির্মাণ শুরু : ২০০৭ সালে আয়নার নির্মাণকাজ শুরু হয়। ক্যামেরাটির নকশা ও নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত প্রায় দুই দশক সময় লেগেছে।
নির্মাণ সমাপ্তি : এসএলএসি ন্যাশনাল অ্যাকসেলারেটর ল্যাবরেটরিতে ক্যামেরাটির নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হয় এপ্রিল ২০২৪-এ।
স্থাপন : এটি ২০২৫ সালের প্রথম দিকে (মার্চ, ২০২৫ নাগাদ) চিলির অবজারভেটরিতে স্থাপন করা হয়েছে।
এলএসএসটি জরিপের লক্ষ্য :
ক্যামেরাটি ব্যবহার করে যে ১০ বছরব্যাপী জরিপ চালানো হবে, তার প্রধান লক্ষ্যগুলো হলো :
ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি : মহাবিশ্বের প্রসারণের রহস্য উদ্ঘাটন এবং ডার্ক এনার্জি ও ডার্ক ম্যাটারের বৈশিষ্ট্যগুলো বোঝা।
সৌরজগতের ইনভেন্টরি : সম্ভাব্য বিপজ্জনক গ্রহাণুসহ সৌরজগতের লাখ লাখ বস্তুর একটি বিস্তৃত তালিকা তৈরি করা।
গতিশীল মহাকাশ অন্বেষণ : সুপারনোভা এবং অন্যান্য ক্ষণস্থায়ী মহাজাগতিক ঘটনাগুলোর ওপর নজর রাখা।
মিল্কি ওয়ের ম্যাপিং : আমাদের নিজস্ব ছায়াপথ, মিল্কি ওয়ের একটি বিশদ, ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করা।
এটি একটি অনন্য মহাজাগতিক চলমান ছবি তৈরি করবে, যা মহাবিশ্বের গতিশীল পরিবর্তনগুলো আমাদের সামনে তুলে ধরবে।