প্রবাহমান যমুনা, করতোয়া, বড়াল ও হুরাসাগর নদীর পলি মিশ্রিত মাটির বিস্তীর্ণ মাঠ এখন গাঢ় হলুদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা শাখা-নদীগুলো শাহজাদপুরকে ধুয়ে-মুছে পরম যত্নে পলিমাটি বিছিয়ে দেয়। এই নরম উর্বর মাটিতে কৃষকের হাতের ছোঁয়ায় প্রাণ সঞ্চারিত হয়ে বিশাল এলাকা নানা রঙে ও ভিন্ন ভিন্ন ঢঙে সেজে উঠেছে।
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন সরিষার হলুদ ফুলের সমারোহ। পৌষের হিমেল বাতাসে দোল খাওয়া সরিষার ফুল আর মৃদু হাওয়ায় তিরতির করে কেঁপে ওঠা হলুদ আভা প্রকৃতিকে করেছে মোহনীয়। এসব ফুলে প্রজাপতি ও মৌমাছির অবিরাম আনাগোনা গ্রামীণ পরিবেশকে আরও মনোমুগ্ধকর করে তুলেছে।
ভোজ্য তেলের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং এলাকার বিস্তীর্ণ ফসলি জমি সরিষা চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় শাহজাদপুরে সরিষার আবাদ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরিষা চাষ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মৌসুমী মৌমাছির তৎপরতাও বেড়েছে। পাশাপাশি সরিষা ফুলের মধু সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন মৌচাষিরা। সরিষা ক্ষেতের পাশে সারি সারি বাক্স বসিয়ে পোষা মৌমাছির মাধ্যমে মধু সংগ্রহ করা হচ্ছে। মৌমাছিরা ফুল থেকে ফুলে উড়ে মধু সংগ্রহ করে বাক্সে জমা করছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলার ১টি পৌরসভা ও ১৩টি ইউনিয়নে মোট ১৬ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে মৌবাক্স স্থাপন করে মধু সংগ্রহ করছেন মৌচাষিরা। কায়েমপুর, জুগ্নীদহ, পারকোলা, টেটিয়ারকান্দা, করশালিকা, চরধুনাইলসহ বিভিন্ন সরিষা ক্ষেত ঘুরে এবং মৌচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত মৌচাষিরা প্রায় ২ হাজার মৌবাক্স স্থাপন করেছেন। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই সরিষা ক্ষেতের পাশে সারি সারি বাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ শুরু হয়েছে।
শাহজাদপুর উপজেলার নরিনা ইউনিয়নের পারকোলা সরিষা ক্ষেতের এক মৌচাষি জানান, তিনি সেখানে ১০০টি বাক্স স্থাপন করেছেন। মধু সংগ্রহের জন্য এসব বাক্স স্টিল ও কাঠ দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়। প্রতিটি বাক্সের ভেতরে সাতটি কাঠের ফ্রেম থাকে, যাতে মোম দিয়ে তৈরি বিশেষ সিট লাগানো থাকে। বাক্সগুলো কালো পলিথিন ও চট দিয়ে মোড়ানো থাকে এবং ভেতরে রানী মৌমাছি রাখা হয়। মৌমাছিরা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে বাক্সে জমা করে।
মৌচাষিরা আরও জানান, চলতি মৌসুমে ইতোমধ্যে সরিষার ফুল থেকে প্রায় ৫ মণ মধু আহরণ করা হয়েছে। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে মধু সংগ্রহ কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে তারা ২০ থেকে ২২ মণ মধু সংগ্রহ করতে পারবেন বলে আশা করছেন। অন্যথায় বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।
শাহজাদপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলায় মোট ১৬ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ জন মৌচাষি প্রায় ২ হাজার মৌবাক্স স্থাপন করে মধু আহরণ করছেন। চলতি মৌসুমে মধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৭ হাজার কেজি। ইতোমধ্যে ৩ হাজার ৯৪১ কেজি মধু সংগ্রহ করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে জানুয়ারির মধ্যেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান করে যাচ্ছেন।