ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়ায় সাতটি সংসদীয় আসনে বিএনপি ঈর্ষণীয় ফল করেছে। জেলার সাতটি আসনেই দলটির প্রার্থীরা বড় ব্যবধানে জয়লাভ করে দুর্গ ফিরিয়ে এনেছে। ২০০১ সালের পর এটিই তাদের বড় ধরনের ভূমিধস বিজয়। এর আগে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির দুর্গে ভাগ বসিয়ে আওয়ামী লীগ দুটি আসনে জয়লাভ করে। পরে ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ায় চারটিতে জাতীয় পার্টি, একটিতে জাসদ ও দুটিতে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি যোগ দিয়ে বগুড়ার মাত্র দুটি আসনে জয়লাভ করে। সেই নির্বাচনে বিএনপির পাঁচটি আসনই হাত ছাড়া হয়ে যায়। ২০০১ সালের পর ২৫ বছর পেরিয়ে এবার দলটি স্বমহিমায় সাতটি আসনেই বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। এবারের নির্বাচনে বগুড়ায় তারেক রহমানসহ নতুন চার মুখ লড়েছেন ধানের শীষ প্রতীকে। তারা হলেন বগুড়া-২ আসনে মীর শাহে আলম, বগুড়া-৩ আসনে আব্দুল মহিত তালুকদার, বগুড়া-৬ আসনে তারেক রহমান নিজে ও বগুড়া-৭ আসনে মোরশেদ মিল্টন। তারা সবাই বিজয়ী হয়েছেন।
মূলত ‘বগুড়া বিএনপির ঘাঁটি। গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের দমন-পীড়নের রাজনীতিতে সেই কথাটি যেন অনেকটাই মাটিচাপা পড়েছিল। তবে এবারের নির্বাচনে সাতটি আসনেই বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিএনপির জয় সেই পুরোনো পরিচয়কে আবারও স্বগর্বে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বগুড়া জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্যমতে, জেলায় মোট ভোটার ২৯ লাখ ৮১ হাজার ৯৪০ জন। সাত আসনে ভোট দিয়েছেন ২১ লাখ ২৪ হাজার ৬৯৮ জন। এর মধ্যে বৈধ ভোট গণনা হয়েছে ২০ লাখ ৮৬ হাজার ৮২৩টি। বিএনপি পেয়েছে ১৩ লাখ ২৮ হাজার ৫৪৬ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত পেয়েছে ৭ লাখ ২৯ হাজার ১৩১ ভোট। মোট বৈধ ভোটের হিসাবে বিএনপি পেয়েছে ৬৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং জামায়াত পেয়েছে ৩৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ ভোট। এ হিসেবে জামায়াত থেকে বিএনপি ভোট বেশি পেয়েছে ৫ লাখ ৯৯ হাজার ৪১৫, যা অবিশ্বাস্য ছিল। নেপথ্যের কারণ হিসেবে নেতারা বলছেন, প্রার্থী বাছায়ে সঠিক পদক্ষেপ, সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ, ব্যাপক সনাতনী ও নারী ভোটারের উপস্থিতি, শঙ্কামুক্ত পরিবেশ ভোটারদের উজ্জীবিত করেছে। যার কারণে বিএনপির প্রার্থীরা দেড় লাখ থেকে শুরু করে আড়াই লক্ষাধিক পর্যন্ত ভোট পেয়েছেন।
জয়ের পর বগুড়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। অনেকেই বলছেন, এ বিজয় জেলার জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর বগুড়া উন্নয়ন বঞ্চিত ছিল বলে অভিযোগ তাদের। এবার উন্নয়নের গতি ফিরবে এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশ আরও এগিয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা তাদের।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমালা ঘেঁটে জানা গেছে, বিএনপি প্রতিষ্ঠার এক বছর পর ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে বগুড়ার সাতটি আসনের সবগুলোতেই জয় পায় দলটি। ৮৬ ও ৮৮ সালের স্বৈরশাসক এরশাদের অধীনে নির্বাচন বয়কট করে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি।
পরে ১৯৯১ সালে আসন বিপ্লবের সূচনাটা শুরু হয় বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরেই। সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রার সেই নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে বগুড়ার ছয়টি আসনে জয়লাভ করে। সেখানে একটি আসন পায় জামায়াত। সেই নির্বাচনে বিএনপি মোট ভোট পায় ৪ লাখ ১৯ হাজার ৭৬৮। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি সাতটি আসনে জয় পায়। তখন ভোট পায় ৬ লাখ ৫৪ হাজার ৯৮টি। ২০০১ সালের নির্বাচনেও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে অভাবনীয় ফল করে দলটি। সেই নির্বাচনেও বগুড়ার সাতটি আসনে জয় পায় বিএনপি। তখন তাদের ভোটের সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখের কাছাকাছি। ২০০৮ থেকে ২৪ পর্যন্ত চারটি সংসদ নির্বাচনের দুটিতেই অংশ নেয়নি বিএনপি।
বগুড়া শহর বিএনপির সভাপতি হামিদুল হক হিরু বলেন, বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের ধারায় বগুড়া আবারও প্রমাণ করেছে, এটি শহীদ জিয়ার হাতে গড়া দল বিএনপির শক্ত ঘাঁটি।
বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা বলেন, ‘বগুড়া বিএনপির ঘাঁটি। এখানকার মানুষ আগেও আমাদের সমর্থন করেছেন, এবারও করেছেন। তাই আমরা সাতটি আসন আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উপহার দিতে পেরেছি।’
তিনি বলেন, ভোটের সময় আমাদের নেতাকর্মী-সমর্থকরা ভোটারের ঘরে ঘরে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে তারেক রহমানকে ভোট দিয়েছে। তারেক রহমান সদরে প্রার্থী হওয়ায় সেই ঢেউ অন্য আসনগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। আর এই কারণেই বিজয় সুনিশ্চিত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই এখন তাদের মূল লক্ষ্য।’