পুলিশি ঝামেলা এড়াতে মাকে অস্বীকার যুগ্ম-সচিবের, আইনি ব্যবস্থা
রাজধানীর মিরপুরের একটি ফ্ল্যাট থেকে বৃদ্ধা মা নুরজাহান বেগমের পচে-গলে যাওয়া লাশ উদ্ধারের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। এই ঘটনায় প্রথমে পুলিশি ঝামেলার ভয়ে নিজের মাকে চিনতে অস্বীকার করলেও, পরে মায়ের মৃত্যুর সত্যতা স্বীকার করেছেন তার ছেলে ও বর্তমান সরকারের যুগ্ম-সচিব এ কে এম আনিসুর রহমান। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার।
বুধবার (৩ জুন) মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কমডোর মো. শফিকুল ইসলাম সরকার (জি) সংবাদমাধ্যমকে বলেন, "শুরুতে পুলিশের ঝামেলা এড়াতে তিনি (আনিসুর রহমান) আমাদের কাছে বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে তিনি স্বীকার করেছেন যে তার মা মারা গেছেন।"
যুগ্ম-সচিবের বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না—জানতে চাইলে তিনি জানান, সচিবালয় থেকে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে তাকে অবহিত করা হয়েছে। তবে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি পাননি তিনি।
আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর
এদিকে, বৃদ্ধা মায়ের এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় যুগ্ম-সচিব এ কে এম আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী।
বুধবার সকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, "গত রাতে তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। আগে তার সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হতে হবে যে ঘটনাটি তার মাকে কেন্দ্র করেই কি না। আমরা পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছি।"
পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন:
"আমাদের দেশে বাবা-মায়ের ভরণপোষণ সংক্রান্ত একটি আইন রয়েছে। সেটি কার্যকর করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে আইন অনুযায়ী অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার এমন নৈতিক স্খলনের বিষয়ে তিনি বলেন, "নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় আসবে। গণমাধ্যমে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।"
তবে এই অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে যুগ্ম-সচিব এ কে এম আনিসুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।
ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয়েছিল পচাগলা লাশ
গত রবিবার (৩১ মে) রাজধানীর মিরপুর-১১ এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ‘৯৯৯’-এ কল পেয়ে নুরজাহান বেগমের পচাগলা ও পোকায় ধরা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপরই ঘটনাটি নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা ও তোলপাড় শুরু হয়। মোংলা পোর্ট কর্তৃপক্ষের বরাতেও জানা যায়, প্রথম দিকে আনিসুর রহমান মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিলেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রতিবেশীদের তথ্য অনুযায়ী, নুরজাহান বেগম দীর্ঘদিন ধরে ওই ফ্ল্যাটে একাকী জীবনযাপন করছিলেন। একই বাসার পাশের কক্ষে তার এক মেয়ে বসবাস করলেও, মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাননি বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়রা জানান, নুরজাহান বেগমের দুই ছেলে আলাদা থাকতেন এবং দীর্ঘদিন মায়ের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না। তার এক ছেলে এ কে এম আনিসুর রহমান সরকারের যুগ্ম-সচিব এবং অন্য ছেলে এ কে এম আশিকুর রহমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিএসই বিভাগের অধ্যাপক। এছাড়া তার মেয়ে একজন স্কুলশিক্ষক।