দৈনিক ভোরের কাগজের অনলাইন প্রধান মিজানুর রহমান সোহেলকে মঙ্গলবার (১৮ নভেম্বর) গভীর রাতে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মিন্টো রোডে গোয়েন্দা কার্যালয়ে রাতভর জিজ্ঞাসাবাদের পর বুধবার (১৯ নভেম্বর) সকালে তাকে বাসায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
তবে মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসায়ীদের সংগঠন ‘মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ’র (এমবিসিবি) সেক্রেটারি এখনো পুলিশ হেফাজতে আছেন বলে জানা গেছে।
ঘটনার পর প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাঈন সায়ের সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ করেন। তার স্ট্যাটাস ছড়িয়ে পড়ার পর গভীর রাতে সাংবাদিককে তুলে নেওয়া নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম ঘটনাটি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে কথা বলার জন্য সোহেলকে আনা হয়েছিল। যাচাই–বাছাই করে ভুল বোঝাবুঝি দূর হলে তাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়।
কেন তুলে নেওয়া হলো—ডিবির ব্যাখ্যা
শফিকুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিক সোহেল একটি প্রতিষ্ঠানের সংবাদ সম্মেলনের কভারেজের জন্য কন্টাক্ট নম্বর ব্যবহার করেছিলেন। ওই প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে সভাপতির পদবি ব্যবহার করে সেখানে তিনি নিজের নম্বর দিয়েছেন। ডিবি আসলে ওই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি–সেক্রেটারিকে খুঁজছিল এবং সেই নম্বরে যোগাযোগ করেই তাকে নিয়ে আসে। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রের স্বার্থ জড়িত থাকায় সংবাদ সম্মেলনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাওয়া স্বাভাবিক।
মিজানুর রহমানের বক্তব্য
বাসায় ফিরে সাংবাদিকদের তিনি জানান, তাকে প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এনইআইআর (ন্যাশনাল ইক্যুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্ট্রার) কার্যকর করার প্রেক্ষাপটে মোবাইল ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ নিয়ে এমবিসিবির সংবাদ সম্মেলনের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। তার মতে, উচ্চপর্যায়ের নির্দেশেই সংবাদ সম্মেলনটি বন্ধ করার চেষ্টা হয়েছে এবং তাকে মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখা হয়েছিল।
ফেসবুকে সোহেলের দীর্ঘ পোস্ট
নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন—
ডিবি পরিচয়ে রাত ১২টার দিকে ৫-৬ জন সদস্য তাকে তুলে নিয়ে যায়।
ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার পর তাকে আটক খাতায় নাম লিখিয়ে গারদে রাখা হয়।
অনেকক্ষণ কেউ তাকে আটক করার কারণ জানাতে পারেনি।
পরে তিনি বুঝতে পারেন, মাত্র ৯ জন ব্যবসায়ীকে সুবিধা দিতে এনইআইআর প্রকল্পের পক্ষে থাকা একটি মহলের প্রভাবেই তাকে আটক করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলন বন্ধ করাই ছিল পুলিশের মূল লক্ষ্য, বলে দাবি করেন তিনি।
তার মতে, এনইআইআর বাস্তবায়ন হলে ২৫ হাজারের বেশি মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, এবং একটি চক্র মনোপলি বাজার তৈরি করতে চায়।
তিনি আরও লেখেন, সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার কারণেই তিনি দ্রুত মুক্তি পেয়েছেন বলে মনে করেন।
জুলকারনাঈন সায়ের যা লিখেছিলেন
ঘটনার রাতেই জুলকারনাঈন সায়ের লিখেছিলেন, সোহেলকে ডিবি পরিচয়ে বাড্ডার বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। তিনি ডিবি প্রধানের সঙ্গে কথা বলার পর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার কথা জানান। তার দাবি, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের স্বার্থে, মোবাইল ব্যবসায়ীদের সংবাদ সম্মেলন ঠেকাতেই সোহেলকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে তুলে নেওয়া হয়েছে। তিনি এ ঘটনার নিন্দা জানান।
মন্ত্রণালয়ের পাল্টা দাবি—অভিযোগ ভিত্তিহীন
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ঘটনাটির সঙ্গে উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবকে জড়ানো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়:
এনইআইআর বাস্তবায়ন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অংশ।
অবৈধ মোবাইল হ্যান্ডসেট বন্ধে বিটিআরসি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষদের সঙ্গে বৈঠক করেছে।
সোহেলকে ডিবি জিজ্ঞাসাবাদ করেছে—এটিকে কাজে লাগিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী অপপ্রচার চালাচ্ছে।
ফয়েজ তৈয়্যব নিজেও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার সঙ্গে সাংবাদিকটির কোনো সম্পর্ক নেই এবং ঘটনাটি নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হচ্ছে।