আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। মনোনয়ন যাচাই-বাছাই ও প্রচারণার পাশাপাশি এই মুহূর্তে সমানতালে চলছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার জনমত জরিপ— কার ঘরে কত ভোট। এরই মধ্যে কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা ও শীর্ষ দৈনিকের প্রকাশিত জরিপ ফলাফল ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এক জরিপের সঙ্গে আরেকটির ফলাফলে বড় ধরনের পার্থক্য থাকায় প্রশ্ন উঠছে— এসব জরিপের পদ্ধতি ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে।
গবেষণা ও জরিপ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নমুনা নির্বাচন, প্রশ্নপত্রের ভাষা এবং তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিতে যথাযথ সতর্কতা না থাকলে জরিপে ‘ভুল প্রতিনিধিত্ব’ বা পক্ষপাতের ঝুঁকি থেকেই যায়। তাদের মতে, চলমান অনেক জরিপেই তাড়াহুড়োর ছাপ স্পষ্ট।
ভিন্ন ভিন্ন জরিপ, ভিন্ন চিত্র
গত বছরের ডিসেম্বরের প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায়— নির্বাচন হলে ৩০ শতাংশ ভোটার বিএনপিকে এবং ২৬ শতাংশ ভোটার জামায়াতে ইসলামিকে ভোট দিতে পারেন। জরিপটি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে সরাসরি সাক্ষাৎকারভিত্তিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। এতে আট বিভাগের ৬৩ জেলার প্রায় পাঁচ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক ভোটার অংশ নেন।
অন্যদিকে চলতি সপ্তাহে বেসরকারি সংস্থা এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (ইএএসডি) প্রকাশিত আরেকটি জরিপে দাবি করা হয়— প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে ভোট দিতে যাচ্ছেন, যেখানে জামায়াতের পক্ষে জনমত ১৯ শতাংশ। একই জরিপে ৭৭ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন বিএনপি সরকার গঠন করবে।
এই দুই জরিপের ফলাফলের মধ্যে বড় পার্থক্য থাকায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে— কোনটি কতটা নির্ভরযোগ্য?
গবেষণা পদ্ধতি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেটিক্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইআইডি) নির্বাহী প্রধান সাঈদ আহমেদ মনে করেন, বর্তমান জরিপগুলো থেকে একটি সামগ্রিক ধারণা পাওয়া গেলেও এগুলোকে পুরোপুরি প্রতিনিধিত্বশীল জনমত হিসেবে ধরে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। তার ভাষায়, প্রশ্নপত্র পক্ষপাতহীন হওয়া, উত্তরদাতা দৈবচয়নের মাধ্যমে নির্বাচন করা এবং তথ্য সংগ্রহ থেকে বিশ্লেষণ পর্যন্ত মানসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি— যা অনেক জরিপেই অনুপস্থিত।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নের ভাষা বা উত্তর বিকল্পের উপস্থাপন এমনভাবে করা হয়, যা উত্তরদাতাকে একটি নির্দিষ্ট দিকে ঝুঁকতে প্রভাবিত করে। গবেষণার ভাষায় এসবকে ‘ট্যাগ প্রশ্ন’ বলা হয়, যা নিরপেক্ষ জরিপের জন্য বড় বাধা।
মাঠপর্যায় ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, বড় আকারের জরিপে তথ্য সংগ্রহকারীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া মাঠে পাঠানোও একটি বড় সমস্যা। সাধারণত মানসম্মত জরিপে একাধিক দিনের প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ে পরীক্ষামূলক তথ্য সংগ্রহের পর মূল জরিপ শুরু হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এই ধাপগুলো এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক চাপের কারণে অনেক ভোটার প্রকৃত মতামত প্রকাশে দ্বিধাগ্রস্ত হন বলেও মনে করেন গবেষকরা। এমন পরিস্থিতিতে জরিপে প্রাপ্ত তথ্য বাস্তব চিত্রের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
আবেগ ও পরিস্থিতির প্রভাব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আবেগ, ঘটনা ও অনিশ্চয়তা খুব দ্রুত মানুষের মতামত বদলে দেয়। ফলে জরিপের তথ্য সময় ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। তিনি মনে করিয়ে দেন, উপাত্ত নিজে থেকে কোনো সিদ্ধান্ত দেয় না— সেগুলো কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার
বিশেষজ্ঞদের অভিমত অনুযায়ী, নির্বাচন ঘিরে জনমত জরিপ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে গবেষণাগত নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ না করলে বিভ্রান্তিকর ফল আসতে পারে। তাই জরিপের ফলাফল দেখার পাশাপাশি এর পদ্ধতি, নমুনা নির্বাচন ও প্রশ্ন কাঠামো— সবকিছুই সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা জরুরি।