ইচ্ছাশক্তি, দৃঢ় মনোবল ও স্বপ্নকে সঙ্গী করলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতাও যে সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, তারই অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রংপুরের কাউনিয়ার অদম্য শিক্ষার্থী কলি রানী।
জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়েও তিনি চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রে পা দিয়ে লিখে অংশগ্রহণ করছেন। তাঁর এই সংগ্রামী পথচলা ইতোমধ্যে এলাকায় ব্যাপক অনুপ্রেরণার সৃষ্টি করেছে।
জানা গেছে, কলি রানী উপজেলার গদাই গ্রামের বাসিন্দা প্রয়াত মনোরঞ্জন রায় ও রুপালী রানীর কন্যা। জন্ম থেকেই তাঁর হাতের আঙুল নেই এবং হাত ছোট ও বাঁকা হওয়ায় তিনি হাত দিয়ে কলম ধরতে পারেন না। কিন্তু শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁর শিক্ষাজীবনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
মাত্র তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি বাবাকে হারান। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট কলি রানী পরিবারের সহযোগিতা এবং নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন। ডান পা দিয়ে ধীরে ধীরে লেখা শেখা শুরু করলেও বর্তমানে তিনি বেশ দ্রুতগতিতে লিখতে সক্ষম।
শুধু পড়ালেখাই নয়, গানেও রয়েছে তাঁর অসাধারণ প্রতিভা। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে গান গেয়ে একাধিক সম্মাননা স্মারক অর্জন করেছেন। পাশাপাশি তিনি পা দিয়েই কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন পরিচালনা করতে পারেন।
কলি রানীর স্বপ্ন, উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে বিসিএস ক্যাডার হয়ে মানুষের সেবা করা। তিনি বিশ্বাস করেন, দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির কাছে কোনো শারীরিক প্রতিবন্ধকতাই বড় নয়।
এর আগে পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় পা দিয়ে লিখেই এ গ্রেড অর্জন করেন তিনি। পরবর্তীতে এসএসসি পরীক্ষাতেও কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন।
কলি রানীর বড় ভাই মন্টু রাম রায় জানান, জন্ম থেকেই তাঁর বোনের হাতের আঙুল না থাকায় হাত দিয়ে লেখা সম্ভব হয়নি। তাই ছোটবেলা থেকেই ডান পা দিয়ে লেখার অনুশীলন শুরু করে। দীর্ঘদিনের চর্চায় এখন সে স্বাভাবিক শিক্ষার্থীদের মতোই দ্রুত লিখতে পারে।
তিনি বোনের উচ্চশিক্ষা ও স্বপ্ন পূরণের জন্য সমাজের বিত্তবান ও হৃদয়বান মানুষের দোয়া এবং সহযোগিতা কামনা করেন।
কাউনিয়া মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও কেন্দ্র সচিব মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, "কলি রানী অন্য পরীক্ষার্থীদের মতোই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে এবং পা দিয়ে উত্তরপত্র লিখছে। শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় শিক্ষা বোর্ডের বিধি অনুযায়ী তাকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছে। আমরা তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও উচ্চশিক্ষায় সফলতা কামনা করি।
কাউনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পাপিয়া সুলতানা বলেন, "কলি রানীর অদম্য ইচ্ছাশক্তি আমাদের সকলের জন্য অনুপ্রেরণা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। আমরা চাই সে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করুক। উপজেলা প্রশাসন তার পাশে থাকবে।
অদম্য সাহস, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসে এগিয়ে চলা কলি রানীর জীবনগল্প প্রমাণ করে—স্বপ্ন দেখার সাহস থাকলে কোনো প্রতিবন্ধকতাই মানুষের সাফল্যের পথে চূড়ান্ত বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।