বিশ্বজুড়ে জানুয়ারি মাস থাইরয়েড সচেতনতা মাস হিসেবে পালিত হয়। এর লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষের মধ্যে থাইরয়েড রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, নিয়মিত পরীক্ষা করার গুরুত্ব তুলে ধরা এবং সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, যাদের পরিবারে থাইরয়েড রোগের ইতিহাস রয়েছে এবং ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়সী ব্যক্তিদের নিয়মিত থাইরয়েড পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশে থাইরয়েড রোগ এখন একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো—আক্রান্তদের বড় একটি অংশই জানেন না যে তারা এই রোগে ভুগছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নারীদের মধ্যে থাইরয়েড সমস্যার হার পুরুষদের তুলনায় প্রায় পাঁচ থেকে আট গুণ বেশি। বিশেষত প্রজনন বয়সী নারী, গর্ভবতী মা এবং মেনোপজ–পরবর্তী নারীরা এই রোগের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন।
থাইরয়েড রোগের ধরন ও লক্ষণ
থাইরয়েড রোগ বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় হাইপোথাইরয়েডিজম, যেখানে থাইরয়েড গ্রন্থি প্রয়োজনের তুলনায় কম হরমোন তৈরি করে। এতে রোগীরা দীর্ঘদিন অবসাদ, ওজন বৃদ্ধি, শীত সহ্য না হওয়া, চুল পড়া, ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, বিষণ্নতা, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া এবং নারীদের ক্ষেত্রে মাসিকের অনিয়মের মতো সমস্যায় ভোগেন।
অন্যদিকে হাইপারথাইরয়েডিজমে থাইরয়েড গ্রন্থি অতিরিক্ত হরমোন উৎপাদন করে। ফলে অল্প সময়েই ওজন কমে যাওয়া, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া বা অনিয়মিত হওয়া, অতিরিক্ত ঘাম, হাত কাঁপা, উদ্বেগ ও অস্থিরতা, ঘুমের সমস্যা এবং কখনো চোখ ফুলে ওঠার মতো লক্ষণ দেখা দেয়।
এ ছাড়া থাইরয়েড গ্রন্থি অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে গেলে গলগণ্ড (গয়টার) তৈরি হয়। পাশাপাশি থাইরয়েড নডিউল ও থাইরয়েড ক্যানসারও গুরুত্বপূর্ণ ও গুরুতর সমস্যা হিসেবে বিবেচিত।
রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা
থাইরয়েড রোগ নির্ণয় তুলনামূলকভাবে সহজ এবং খরচও কম। সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে—যেমন টিএসএইচ (Thyroid Stimulating Hormone), টি৩ ও টি৪—থাইরয়েডের কার্যকারিতা নির্ণয় করা যায়। প্রয়োজন হলে আল্ট্রাসনোগ্রাফি, থাইরয়েড স্ক্যান বা এফএনএসি পরীক্ষা করা হয়।
ভালো খবর হলো, থাইরয়েড রোগ সম্পূর্ণ চিকিৎসাযোগ্য এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য। হাইপোথাইরয়েডিজমে থাইরক্সিন হরমোন প্রতিস্থাপন থেরাপি অত্যন্ত কার্যকর। নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে রোগীরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। হাইপারথাইরয়েডিজমের ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা অনুযায়ী অ্যান্টি-থাইরয়েড ওষুধ, রেডিওঅ্যাকটিভ আয়োডিন থেরাপি বা প্রয়োজনে অস্ত্রোপচার করা হয়।
গর্ভাবস্থায় থাইরয়েডের গুরুত্ব
অনিয়ন্ত্রিত থাইরয়েড সমস্যা গর্ভপাত, অকাল প্রসব, শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা এবং জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি বাড়ায়। তাই গর্ভধারণের আগে এবং গর্ভাবস্থায় নিয়মিত থাইরয়েড পরীক্ষা করানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ
২০২৬ সালে থাইরয়েড সচেতনতা বাড়াতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার, প্রত্যন্ত এলাকায় বিনামূল্যে স্ক্রিনিং ক্যাম্প আয়োজন এবং স্কুল–কলেজে শিক্ষামূলক কর্মসূচি জোরদার করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
যদিও থাইরয়েড রোগ পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সব সময় সম্ভব নয়, তবে কিছু অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে সহায়ক। নিয়মিত আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার, পুষ্টিকর খাবার—বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছ, দুগ্ধজাত খাদ্য ও সবুজ শাকসবজি—গ্রহণ করা উচিত। সেলেনিয়াম ও জিংকসমৃদ্ধ খাবার থাইরয়েডের জন্য উপকারী। পাশাপাশি মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ব্যায়াম ও পর্যাপ্ত ঘুম থাইরয়েড গ্রন্থিকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
থাইরয়েড রোগকে অনেক সময় ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। তবে সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এই রোগ সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
লেখক: হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ, সহযোগী অধ্যাপক
এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
চেম্বার: উত্তরা ক্রিসেন্ট ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার–২, সেক্টর–৭, উত্তরা, ঢাকা
হটলাইন: ১০৬৭৩