Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

Home Ad
collapse
Home / স্বাস্থ্য / অনিয়মে কাবু শিশু হাসপাতাল - Chief TV

অনিয়মে কাবু শিশু হাসপাতাল - Chief TV

2026-05-23  ডেস্ক রিপোর্ট  30 views
অনিয়মে কাবু শিশু হাসপাতাল - Chief TV

দেশের শিশুস্বাস্থ্যের সর্বোচ্চ বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র ‘বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট’ এখন নানা অনিয়ম, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জর্জরিত। নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বজনপ্রীতি, বিতর্কিত প্রকল্প অনুমোদনের চেষ্টা এবং চরম প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে প্রতিষ্ঠানটির চিকিৎসা ও শিক্ষার মান নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সরকার পরিবর্তন হলেও হাসপাতালটি নিয়ন্ত্রণ করা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের প্রভাব কমেনি, বরং সাম্প্রতিক সময়ে অনিয়ম আরও বেপরোয়া রূপ নিয়েছে।

নিয়োগ ও পদোন্নতিতে ‘বাণিজ্য’ ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা

হাসপাতালের বিভিন্ন স্তরে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এখানে নিয়োগ প্রক্রিয়া এখন এক ধরনের ‘কমার্শিয়াল প্র্যাকটিসে’ পরিণত হয়েছে।

গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রয়োজনীয় গবেষণা প্রকাশনা, শিক্ষাদানের অভিজ্ঞতা ও একাডেমিক যোগ্যতা ছাড়াই বেশ কয়েকজনকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে:

ডা. ইসরাত লাকি: ২০১১ সালে মেডিকেল অফিসার পদ ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলেও, সম্প্রতি ‘বৈষম্যের’ অভিযোগ তুলে সরাসরি অধ্যাপক পদে যোগ দেন, যা সম্পূর্ণ অবৈধ বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

ডা. মো. শাহজাহান: ২০১৯ সালে সব ধরনের অবসর সুবিধা নেওয়ার পর ৫ আগস্টের পর আবার পূর্ণ অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন।

অধ্যাপক নাজমা ইয়াসমিন: একটি বেসরকারি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট মেডিকেল কলেজে কর্মরত থাকা অবস্থায় একই সময়ে দুই প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন-ভাতা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

ডা. আজহার: অবসরের পর নিয়ম ভেঙে উপপরিচালক (হাসপাতাল) পদে যোগ দেন। এই পদটি সাধারণত কর্মরত সহযোগী অধ্যাপকদের জন্য সংরক্ষিত।

ডা. কামাল: মাত্র ২ বছরের ডিপ্লোমা (ডিসিএইচ) ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও সহকারী থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে দুটি পদোন্নতি পেয়েছেন এবং বর্তমানে অধ্যাপক হওয়ার চেষ্টা করছেন। তাকেই এসব অনিয়মের অন্যতম পরিকল্পনাকারী বলা হচ্ছে।

এছাড়া, ৫ আগস্টের পর কোনো জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি বা পরীক্ষা ছাড়াই সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে অ্যাডহক ভিত্তিতে ৬৫ জন চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়। তীব্র সমালোচনার মুখে পরিচালনা বোর্ড এটি বাতিল করলেও জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। একই সাথে উচ্চতর ডিগ্রি (এমএস, এমডি বা এফসিপিএস) ছাড়া ২২ জন ডিপ্লোমাধারী চিকিৎসককে সহকারী ও সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়ায় চিকিৎসা শিক্ষার মান মারাত্মক ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

নিয়ম ভাঙছেন চেয়ারম্যান, পরিচালকের পদত্যাগ

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ কে এম আজিজুল হকের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও আর্থিক অনিয়মের পাহাড়সম অভিযোগ উঠেছে। তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যক্তিগত অফিস স্থাপন করেছেন এবং হাসপাতালের তীব্র যানবাহন সংকটের মধ্যেই মন্ত্রণালয়ের কথিত ভুয়া অনুমতিপত্র দেখিয়ে প্রায় ৪৮ লাখ টাকা মূল্যের একটি গাড়ি নিজের ব্যবহারের জন্য নিয়েছেন।

আটজন চিকিৎসকের একটি সিন্ডিকেট পুরো প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ। এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির কারণে সম্প্রতি হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহবুবুর রহমান পদত্যাগ করেছেন। বর্তমানে পরিচালক পদের জন্য ডা. নাজমা ও অধ্যাপক ডা. রিয়াজ মোবারকের পক্ষে জোর লবিং চলায় হাসপাতালের অভ্যন্তরে তীব্র উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।

৩৮৩ কোটি টাকার প্রকল্প: হরিলুটের পাঁয়তারা?

বিগত সরকারের আমলে অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত সি-ব্লক ভবনের ওপর ভিত্তি করে ‘বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল সম্প্রসারণ-২’ নামের একটি প্রকল্প পুনরায় চালুর তোড়জোড় চলছে, যা আগের প্রশাসন বাতিল করেছিল।

৩৮৩ কোটি টাকার এই প্রস্তাবিত প্রকল্পে শয্যা সংখ্যা সামান্য বাড়লেও সিংহভাগ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের নামে। অভিযোগ রয়েছে, অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনার নামে এখানে বড় অঙ্কের সরকারি অর্থ অপচয়ের পাঁয়তারা করছে একটি চক্র। এমনকি নকশাগত ত্রুটির কারণে এই ভবনের পার্কিংয়ের প্রবেশপথ এতটাই সংকুচিত যে সেখানে অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশ করাই কঠিন।

এই সিন্ডিকেটের পেছনে নেসার উদ্দিন (অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর, ডেভেলপমেন্ট) নামের এক কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি ডেপুটি ডিরেক্টরের (ফাইন্যান্স) মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হাতিয়ে নিয়েছেন এবং আর্থিক খাতগুলোতে নিজস্ব লোক বসিয়ে শক্তিশালী চক্র তৈরি করেছেন।

আবাসন ও অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা

হাসপাতালের নিজস্ব ৬ দশমিক ১ একর জমির ওপর নির্মিত স্টাফ কোয়ার্টারটি বেদখল হয়ে আছে। ১৭৪টি পরিবারের মধ্যে ১৪০টি পরিবারই পাশের ‘নিটোর’ (পঙ্গু হাসপাতাল) এর কর্মচারী। জমির খাজনা ও কর শিশু হাসপাতাল পরিশোধ করলেও এর সুফল তারা পাচ্ছে না।

বর্তমানে হাসপাতালে চেইন অব কমান্ড সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়মিত উপস্থিতি, ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক এবং রোগী বাণিজ্যের কারণে সাধারণ রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

সদ্য বিদায়ী পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুল হক বলেন:

"শারীরিক অসুস্থতার কারণে আমি পদত্যাগ করেছি। ৩৮৩ কোটি টাকার প্রকল্পটি যৌক্তিক, কারণ হাসপাতালে সিটি স্ক্যান ও এমআরআই মেশিন নেই। আবাসন সমস্যাটি জটিল এবং এটি সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। আর ৫ আগস্টের পর যে নিয়োগ-পদোন্নতি হয়েছে, তা অনৈতিক নয়। তারা অতীতে বৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন, তাই তাদের ফিরিয়ে আনা হয়েছে। চেয়ারম্যানের গাড়ি ব্যবহার বা অফিস করার ক্ষেত্রে আইনের কোনো লঙ্ঘন হয়নি।"

পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ কে এম আজিজুল হক বলেন:

"নিয়োগ ও পদোন্নতিতে কোনো আইনি ব্যত্যয় ঘটেনি। চেয়ারম্যান হিসেবে আমি যখন খুশি হাসপাতালে যাব, অফিস করব। হাসপাতালের গাড়ি আমি ব্যবহার করতেই পারি। গাড়ি বরাদ্দের চিঠি ভুয়া—একথা কে বলেছে? তার নাম না বললে আমি উত্তর দেব না।"
প্রকল্পের বিষয়ে তিনি বলেন, "শেখ হাসিনার আমলে কাজ তিনতলা পর্যন্ত হয়ে আটকে ছিল, আমরা সেটা শেষ করব।" তবে হাসপাতালে নতুন সিন্ডিকেট ও পরিচালকের পদত্যাগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি "কিছুই জানেন না" বলে মন্তব্য এড়িয়ে যান।


Share: