কাঠফাটা রোদ্দুরে পুড়ে যাচ্ছে মাটি। আকাশে মেঘের লেশমাত্র নেই, বাতাস যেন থমকে আছে। দুপুর গড়াতেই মাঠজুড়ে আগুনের মতো তাপ ছড়িয়ে পড়ে। সেই রোদ উপেক্ষা করে মাথায় পুরোনো গামছা চাপা দিয়ে বিস্তীর্ণ ফসলের জমিতে আগাছা পরিষ্কার ও গাছের গোড়ায় মাটি দিচ্ছেন একদল নারী। সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ে, তখনও থামে না তাদের চিন্তা। ঘরে ফিরে আবার চুলা জ্বালানো, সন্তানদের খাওয়ানো, অসুস্থ স্বামীর সেবা সবকিছুই সামলাতে হয় একা হাতে। বিশ্রাম যেন তাদের জীবনের অভিধানে এক অলেখা শব্দ।
সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের চৌরঙ্গী বাজারের পাশে এক শসা খেতে কাজ করছিলেন একদল নারী। মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন রূপসী রানী (৩৫)। ক্লান্ত চোখ, রোদে পোড়া মুখ। প্রতিবেদককে দেখে এক মুহূর্ত থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর যেন জমে থাকা কথাগুলো বেরিয়ে এলো।
‘দশ ঘণ্টা হাড্ডিভাঙা খাটুনি করি, তাও তিনশ টেকা। এই দিয়া কি আর সংসার চলে বাপু! এলা একদিন কামে না গেলে চুলাত হাড়ি উঠে না। বাজারে গেলেই মনে হয় আগুন লাগিছে। আলু, পটল, বেগুন কিনতেই টেকা শেষ হইয়া যায়। ছুয়ালারাও আর এইডা-সেইডা খাবা চায় না। ছোট মাইডা কয়, ‘মা, মাছ ভাত খামু।’ ওই কথা শুনলেই বুকটা ফাইটা যায়।
বলতে গলা ভারী হয়ে আসে রানীর। চোখের কোণে চিকচিক করে পানি, কিন্তু সেই পানি মুছারও সময় নেই। কারণ চোখের পানিতে সংসার চলে না। চলে শুধু শরীরের ঘাম দিয়ে।
রূপসীর মতো প্রতিমা, বাচ্চাই, অশুবালা, বৈতালী রানী ও শুমিলা রানীদের জীবনও একই বৃত্তে আটকে আছে। সকাল ৮টা বাজলেই তারা ছুটে যান অন্যের জমিতে। দিনভর রোদে পুড়ে, কাদায় মেখে, ঘাম ঝরিয়ে সন্ধ্যায় হাতে পান মাত্র ৩০০ টাকা। এই টাকাতেই চালাতে হয় পুরো সংসার।
তবে প্রশ্ন উঠছে, একই মাঠে সমান সময় কাজ করেও নারী শ্রমিকরা কেন পুরুষদের তুলনায় কম মজুরি পান? তাদের দাবি, একই ধরনের কাজে পুরুষ শ্রমিকরা যেখানে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পান, সেখানে নারীদের দেওয়া হয় ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা।
রূপসীর কথা শেষ হতে না হতেই পাশে দাঁড়ানো বৃদ্ধা অশুবালা কাঁপা গলায় ঢাকা পোস্টকে বলেন, এখন ৩০০ টেকা দিয়া কী হয়? এক লিটার সুয়াবিন তেল কিনতেই লাগে ২০০ টেকা। মাছ-মাংসে হাত দেওয়া যায় না। মোটা চাল আর আলু তরকারি ছাড়া কপালে আর কিছু নাই। সারাদিন রোদে পুড়ে কাম করি, এই টেকা দিয়া বাজার করি। বাড়ির বুড়াডা অসুস্থ তার ওষুধ কিনতে হয়। আবার কিস্তির চাপ তো আছেই। একদিন কামে না আসলে ঘরে খাবার থাকে না।
তিনি আরও বলেন, আগে সরকার টিসিবির কার্ড দিছিল, এখন সেটাও বন্ধ। এই অবস্থায় হামরা কেমনে বাচমু বলেন?
প্রতিমা বলেন, সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনি করি। রোদে পুড়ে কাজ করি, কিন্তু দিনশেষে যে টাকা পাই, তা দিয়ে সংসার চলে না। ৩০০ টাকা দিয়ে এখন কী হয়? বাজারে গেলেই সবকিছুর দাম আগুনের মতো। এক কেজি চাল, ডাল, তেল কিনতেই টাকা শেষ হয়ে যায়। আমার ছোট বাচ্চাটা আজ কাজে আসার সময় বলে- মা আসার সময় মাছ নিয়ে এসো। কিন্তু ওই কথা শুনলে বুকটা কাইটা যায়। অনেক সময় নিজের পেটে খাইতে পারি না, সন্তানদের দিতেই হয়। সংসারে অভাব লেগেই আছে, একদিন কামে না গেলে চুলা জ্বলে না।
তিনি আরও বলেন, একই কাজ পুরুষরাও করে কিন্তু তারা বেশি টাকা পায়। আমরা নারী তাই আমাদের মজুরিও কম। এইটা কি ঠিক? আমরা তো কম কাজকরি না, বরং বেশি কষ্ট করি। কিন্তু সেই কষ্টের দাম কেউ দেয় না। শুধু ঘাম ঝরাই, আর ঘরে ফিরি খালি হাতে। আমাদের জীবনটা এইভাবেই চলতেছে।
স্থানীয় কৃষক জয়নুল, আইনুল, সাদ্দাম ও আল মামুন বলেন, কৃষি মৌসুমে নারী শ্রমিকদের ওপর নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি। আগাছা পরিষ্কার, চারা রোপণ, গাছের পরিচর্যা এসব কাজে নারীরাই বেশি দক্ষ। কিন্তু সমস্যা হলো, বাজারদর যেভাবে বাড়ছে, সেই অনুযায়ী মজুরি বাড়ানো যায় না। ফসলের দাম তো আগের মতোই থাকে, আবার অনেক সময় ঠিকমতো দামও পাই না। সার, বীজ, কীটনাশকের দাম বাড়ছে, সেচ খরচ বাড়ছে।
তারা আরও বলেন, সব মিলে চাষ করতে গিয়ে আমরা হিমশিম খাই। এই অবস্থায় শ্রমিকদের মজুরি বাড়াইতে গেলে আমাদেরই লোকসান হয়। তবে আমরা বুঝি, এই ৩০০ টাকা দিয়া তাদের সংসার চলে না। বাজারে গেলেই সবকিছুর দাম আগুন। তারা যে কষ্ট করে, সেই কষ্টের তুলনায় মজুরি খুবই কম। কিন্তু আমাদের অবস্থাও এমন একদিকে খরচ বাড়তেছে, আরেকদিকে ফসলের ন্যায্য দাম পাই না।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা কৃষি অফিসার মো. নাসিরুল আলম বলেন, কৃষি উৎপাদনে নারী শ্রমিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আগাছা পরিষ্কার, চারা রোপণ এবং ফসল পরিচর্যায় তাদের দক্ষতা প্রশংসনীয়। তবে আমরা লক্ষ্য করছি নারী-পুরুষের মজুরির মধ্যে কিছুটা বৈষম্য রয়েছে, যা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার প্রয়োজন রয়েছে। কৃষি বিভাগ থেকে আমরা নিয়মিতভাবে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও শ্রম সাশ্রয়ী পদ্ধতি প্রচারের কাজ করছি, যাতে শ্রমিকদের ওপর চাপ কমে এবং উৎপাদন খরচও নিয়ন্ত্রণে থাকে।
আর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. খাইরুল ইসলাম বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতিতে দিনমজুর ও নারী শ্রমিকদের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি যেমন ভিজিডি, ভিজিএফ এবং টিসিবির মাধ্যমে সহায়তা দিয়ে থাকে। তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে নিম্নআয়ের মানুষের কষ্ট কিছুটা বেড়েছে। আমরা স্থানীয় প্রশাসন হিসেবে এসব পরিবারের তালিকা হালনাগাদ করে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতেও কাজ করা হচ্ছে।