Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

Home Ad
collapse
হোম / আন্তর্জাতিক / ৪৫ বাংলাদেশি গ্রেফতার, উত্তপ্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি- Chief TV

৪৫ বাংলাদেশি গ্রেফতার, উত্তপ্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি- Chief TV

2025-11-02  ডেস্ক রিপোর্ট  164 views
৪৫ বাংলাদেশি গ্রেফতার, উত্তপ্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি- Chief TV

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে আবারও তীব্র উত্তেজনা। বাংলাদেশে ফেরার চেষ্টা করতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় ধরা পড়েছেন অন্তত ৪৫ জন বাংলাদেশি নাগরিক। তাদের মধ্যে রয়েছেন ১৫ জন নারী ও ১১ জন শিশু।

বৈধ নথিপত্র ছাড়াই সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা চালানোর সময় হাকিমপুর এলাকায় বিএসএফ সদস্যরা তাদের আটক করেন। পরে বসিরহাট থানার হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন বসিরহাটের পুলিশ সুপার হোসেন মেহেদি রহমান।

এই ঘটনার পর থেকেই সীমান্তজুড়ে উদ্বেগ ও রাজনৈতিক উত্তাপ বেড়েছে। কারণ, একই সময়ে চলছে পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধন অভিযান—‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR)’। এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে ভয় ও গুজবের পরিবেশ।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভোটার তালিকা থেকে নাম কেটে যেতে পারে। অনেকের হাতে নেই ২০০২ সালের আগের নথিপত্র, যা এখন নাগরিকত্ব প্রমাণের অন্যতম শর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মহম্মদ আলম বলেন,
“আমার ভোটার কার্ডে নাম আছে, ভোট দিয়েছি, বউয়েরও নাম আছে। কিন্তু ২০০২ সালের আগের কোন কাগজ নেই। এখন যদি নাম কেটে দেয়, কোথায় যাব?”

একই ভয়ের কথা জানালেন স্থানীয় নারী সাবিনা বিবি,
“আমি এখানেই জন্মেছি, কিন্তু মা-বাবার কোন কাগজ নেই। যদি তাদের দেশ ছাড়তে হয়, আমি একা থাকব কীভাবে? সবাই ভীষণ আতঙ্কে আছি।”

স্বরূপনগরে ধৃতদের ঘটনা এই ভয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে বলেন,
“বাংলাদেশি মুসলমান তাড়াতাড়ি বাংলা ছাড়, পালাও—ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট।”
তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন, “নিউ মার্কেট এক সময় ফাঁকা করে দিয়েছিলাম, আবার করব। আগামী ২-৩ দিনের মধ্যে ফাঁকা হয়ে যান।”

অপরদিকে শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ পাল্টা প্রশ্ন তোলেন,
“বাংলাদেশি ঢুকল কী করে? সীমান্ত তো বিএসএফের অধীনে। আগে ঢুকেছে, এখন বের হচ্ছে, আর কেন্দ্রীয় সরকার বলছে সীমান্ত খুলে দেবে—এ কেমন দ্বিচারিতা?”

রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝখানে সাধারণ মানুষ যেন আরও বিভ্রান্ত ও আতঙ্কিত। প্রশাসনের একাংশ জানাচ্ছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এখন বহু মানুষ নিজের পরিচয় নিয়েই সন্দেহে পড়েছেন। যাদের পূর্বপুরুষ বহু বছর আগে এ অঞ্চলে এসেছেন, তারা এখন নাগরিকত্বের প্রমাণ নিয়ে দুশ্চিন্তায়।

স্থানীয় সমাজকর্মীরা বলছেন,
“যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম সীমান্তে বাস করছে, তারা এখন হঠাৎ করেই ‘অবৈধ’ ট্যাগ পাচ্ছে—এটা অমানবিক।”

এদিকে সীমান্তবর্তী এলাকায় রাতের টহল ও নজরদারি জোরদার করেছে বিএসএফ। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, SIR প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশরপাড়া, বাগদা, গাইঘাটা, হাকিমপুর, হেমতাবাদসহ একাধিক অঞ্চলে বহু পরিবার আত্মগোপনে চলে গেছে।

প্রশাসন বলছে, এই আতঙ্ক অযৌক্তিক। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি ভিন্ন। এক শিক্ষক জানান,
“গ্রামে এখন লোক কমে গেছে। যারা পারছে আত্মীয়ের বাড়ি চলে গেছে, কাগজপত্র নিয়ে হুড়োহুড়ি শুরু হয়েছে।”

রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি ক্রমেই বিস্ফোরক আকার নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি এক সভায় বলেন,
“দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় সবচেয়ে বড় বিপদ অনুপ্রবেশকারীরা। ভারতে থাকা সব অনুপ্রবেশকারীকে বের করেই ছাড়ব।”

এই মন্তব্যের পর থেকেই রাজ্যে বিজেপি নেতারা আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছেন। অন্যদিকে তৃণমূলের দাবি, “অনুপ্রবেশের অভিযোগ পুরোটাই রাজনৈতিক চাল—ভোটের আগে আতঙ্ক ছড়ানোর কৌশল।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষই নিজেদের ভোটব্যাঙ্ককে সুসংহত করার চেষ্টা করছে। একদিকে ভয় ও জাতীয়তাবাদের বার্তা, অন্যদিকে সহানুভূতি ও মানবিকতার রাজনীতি—দুই দিকেই চলছে ভোটের হিসাব। কিন্তু বাস্তবে সবচেয়ে বিপাকে পড়ছেন সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষ।

এখন প্রশ্ন উঠছে—ধৃত ৪৫ জন সত্যিই কি অনুপ্রবেশকারী, নাকি তারা সেই আতঙ্কিত মানুষের অংশ যারা নিজেদের নাগরিকত্ব নিয়েই বিভ্রান্ত?

বিএসএফ ও পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ধৃতদের পরিচয় যাচাইয়ের অগ্রগতি জানায়নি। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই ধরনের ঘটনায় আইনের পাশাপাশি মানবিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

একাধিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে, “অবৈধ অনুপ্রবেশের নামে বহু প্রকৃত নাগরিকও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্ত এলাকায় কিছু দালাল চক্র এখন ভয়কে কাজে লাগিয়ে টাকা আদায় করছে—নাম বাদ যাবে, জেলে পাঠানো হবে বলে ভয় দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। ফলে আতঙ্কের পাশাপাশি বাড়ছে অসহায়ত্বও।

এক প্রবীণ সমাজকর্মীর ভাষায়,
“এই মুহূর্তে সবচেয়ে দরকার প্রশাসনের আশ্বাস। কিন্তু সবাই কথা বলছে রাজনীতি।”

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, SIR প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছ ও মানবিকভাবে সম্পন্ন না হয়, তবে এটি এক নতুন সামাজিক বিভাজনের জন্ম দেবে। কারণ সীমান্তের দুই পাশে একই ভাষা, সংস্কৃতি ও সম্পর্কের মানুষ—তাদের ওপর এই সন্দেহ ও বিভাজন ভবিষ্যতে এক ভয়াবহ মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

রাজনীতি যাই হোক, মানবিক বিবেচনাই এখন সময়ের দাবি।


Share:

Single Page