Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

Home Ad
collapse
হোম / তথ্যপ্রযুক্তি / ইরানে যুদ্ধ চালাচ্ছে কে, মানুষ নাকি এআই - Chief TV

ইরানে যুদ্ধ চালাচ্ছে কে, মানুষ নাকি এআই - Chief TV

2026-03-12  তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক  27 views
ইরানে যুদ্ধ চালাচ্ছে কে, মানুষ নাকি এআই - Chief TV

ইরানের যুদ্ধই প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর যুদ্ধ নয়। কিন্তু এই প্রথম এমন একটা যুদ্ধ দেখা যাচ্ছে, যেখানে এআই নেহাত কেরানির কাজ করছে না; বরং প্রায় স্টেজ ম্যানেজারের মতো আলো-আঁধারি, প্রবেশ-প্রস্থান, সংলাপ—সব একাই সামলে দিচ্ছে। মানুষজন মঞ্চে আছে বটে, কিন্তু তাদের কাজ ক্রমশ ‘হ্যাঁ স্যার, সই করে দিলাম’ গোত্রের হয়ে যাচ্ছে।

এখানে আধুনিকতার যে আত্মপ্রশংসা লুকিয়ে আছে, তা যেমন চমকপ্রদ, তেমনি ভয়ংকরও। কারণ, সভ্যতা যত এগোয়, সে প্রায়ই হত্যার কায়দাকে আরও পরিচ্ছন্ন, দ্রুত এবং নৈতিক ভাষায় মুড়ে ফেলে। সেই শিরদাঁড়া ঠান্ডা করা ভদ্রতাই এখানে আসল বিষয়।

যুদ্ধ এখন আর কেবল বন্দুকের ব্যবসা নয়, ড্যাশবোর্ডেরও ব্যবসা। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন পোস্ট-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, অপারেশন এপিক ফিউরির প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১ হাজারটি লক্ষ্যবস্তু বাছাই ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে ম্যাভেন স্মার্ট সিস্টেম ব্যবহার করেছে। একই সূত্র বলছে, পালানটিরের তৈরি এই সিস্টেম স্যাটেলাইট, নজরদারি, ড্রোন ফুটেজ ও অন্যান্য গোয়েন্দা তথ্য একত্র করে রিয়েল টাইম টার্গেটিং ও টার্গেট-প্রায়োরিটাইজেশনে সাহায্য করছে। যুদ্ধের ভাষায় একে বলা হয় দক্ষতা। আর সাধারণ ভাষায় একে বলে হত্যাকে অ্যাসেম্বলি লাইনে তোলা।

শোনা যাচ্ছে, ম্যাভেনের ভেতরে এখনো ক্লডনির্ভর ব্যবস্থাই ব্যবহৃত হচ্ছে; অথচ একই সময়ে পেন্টাগন ক্লডের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিককে সাপ্লাই-চেইন রিস্ক বা সরবরাহ-শৃঙ্খলের ঝুঁকি বলে চিহ্নিত করেছে। রয়টার্স জানাচ্ছে, এই তকমা কার্যকর হওয়ার ফলে পেন্টাগনের জন্য কাজ করা ঠিকাদারেরা অ্যানথ্রপিকের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে না।

আবার একই সময়ে নানা প্রতিবেদন জানাচ্ছে, বাস্তবে ক্লডকে পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা এতটা সহজ হচ্ছে না। কারণ, সেটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ইতিমধ্যেই গেঁথে গেছে। আধুনিক রাষ্ট্রের এই দ্বিমুখিতা নতুন কিছু নয়। যে প্রযুক্তিকে দরকার, তাকে আগে কোলে তোলো; পরে সে সীমা টানতে চাইলে তাকে সন্দেহজনক বলে দাগিয়ে দাও। রাজনীতির ইতিহাসে এর নাম নীতি নয়, এর নাম সুবিধা।

সিস্টেম নিজে বোমা ফেলে না—এই কথাটা বারবার এমনভাবে বলা হচ্ছে, যেন তাতেই নৈতিকতার শংসাপত্র বা ছাড়পত্র পাওয়া যায়। ‘ও তো গুলি চালায়নি, শুধু কাকে গুলি করা উচিত, তার তালিকা বানিয়েছে’—এই যুক্তির মধ্যে সেই পুরোনো আমলাতান্ত্রিক নিষ্কৃতির গন্ধ আছে। কসাইখানার নকশা যিনি আঁকলেন, তাঁর হাত রক্তে ভেজেনি, কাজেই তিনি নির্দোষ!

ম্যাভেন কমান্ডারের টেবিলে লক্ষ্যবস্তুর একটি অগ্রাধিকারের তালিকা তুলে দেয়, অর্থাৎ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নাকি এখনো মানুষের হাতেই। কিন্তু সিদ্ধান্ত যখন বিপুল গতি ও ডেটার ভারে এমন সিস্টেম-নির্ধারিত প্রস্তাবের মোড়কে আসে, তখন মানুষ কতখানি বিচার করছে আর কতখানি শুধু অনুমোদন দিচ্ছে, সেই প্রশ্নটাই আসল।

লুপের মধ্যে মানুষ আছে কথাটা অনেক সময় নৈতিকতার সিঁদুরটুকুর মতো; বিয়েটা অন্যত্র সেরেই ফেলা হয়েছে! ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের সময় এই ধরনের টার্গেট চিহ্নিতকরণে প্রায় ২ হাজার জন বিশ্লেষক লাগত; আর এখন সেই কাজ নাকি প্রায় ২০ জনের আশপাশে নামিয়ে আনা গেছে। এমন তথ্য চলতি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই তুলনা শুধু প্রযুক্তিগত উন্নতির গল্প নয়। এটি রাষ্ট্রের সেই পুরোনো স্বপ্নের গল্প, যেখানে যুদ্ধ থেকে ঘর্ষণ সরিয়ে ফেলা হবে, দ্বিধা সরিয়ে ফেলা হবে, মানবিক বিলম্ব সরিয়ে ফেলা হবে। যুদ্ধ যেন হয়ে উঠবে একটি নির্বিঘ্ন সফটওয়্যার প্রসেস! কার্ল ফন ক্লজভিৎজ আজ বেঁচে থাকলে হয়তো বলতেন, ‘যুদ্ধ হলো রাজনীতির অন্য মাধ্যম।’ আমাদের কালে সেটাকে খানিকটা আপডেট করে বলতে হয়, যুদ্ধ হলো রাজনীতির এপিআই কল!

বিশেষজ্ঞরা একটি অদ্ভুত তুলনা টেনেছেন, ম্যাভেন নাকি কেবল টার্গেটই বানায় না, কখনো কখনো কোন ইউনিট কোন মিশনে যাবে, সেই মেলবন্ধনেও সাহায্য করে। উবার যেমন যাত্রী ও ড্রাইভারকে জুড়ে দেয়, ঠিক তেমনি! শুনতে খুব ঝকঝকে, দক্ষ ও স্টার্টআপ-ধর্মী মনে হয়। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বেশি গা ছমছম করে ওঠে। কারণ, উবারে ভুল ম্যাচ হলে কেউ হয়তো একটু দেরিতে বাড়ি পৌঁছায়। কিন্তু যুদ্ধে ভুল ম্যাচ হলে একটি গ্রাম, একটি হাসপাতাল, একটি স্কুলে থাকা নিরীহ মানুষজন ইতিহাস থেকে চিরতরে বাদ পড়ে যায়। সিলিকন ভ্যালির রূপক যুদ্ধক্ষেত্রে এসে পড়লে রসিকতা ফুরোয়, দায়িত্বের প্রশ্ন শুরু হয়।

এআই এখন ড্রোন ন্যাভিগেশন, নজরদারি ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণে বড় ভূমিকা নিয়েছে। গাজায়ও বিভিন্ন এআই ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়েছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর এক প্রাক্তন চিফ অব স্টাফ বলেছেন, একটি সিস্টেম প্রতিদিন প্রায় ১০০টি টার্গেট তৈরি করতে পারত, যেখানে আগে বছরে মাত্র ৫০টির মতো হতো।

এই তুলনাগুলোর মধ্যে যুদ্ধের শিল্পায়নের গল্প লুকিয়ে আছে। আগে যেখানে লক্ষ্যবস্তু খোঁজা ছিল দুরূহ, বিরল ও ধীর; এখন তা হয়ে উঠছে ধারাবাহিক, স্কেলযোগ্য ও যান্ত্রিক। একসময় হয়তো কতজন মরল তা হিসাব না করে কত কম সময়ে কতটা মারাত্মক প্রক্রিয়া চালানো গেল সেই দক্ষতার হিসাব করা হবে। মানবসভ্যতার অনেক উন্নতির ইতিহাসই আসলে এই বাক্যটির ফুটনোট: ‘আমরা নৃশংসতাকে আরও কার্যকর করেছি।’

এবার নির্ভুলতার কথায় আসা যাক। এখানেই প্রযুক্তির পাঞ্জাবির ভাঁজ খুলে যায়। ব্লুমবার্গে প্রকাশিত এবং অন্যত্র উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ১৮তম এয়ারবর্ন কোরের মানব বিশ্লেষকেরা যেখানে প্রায় ৮৪ শতাংশ সময় সঠিক অবজেক্ট শনাক্ত করতে পেরেছেন, সেখানে ম্যাভেনের সাফল্যের হার প্রায় ৬০ শতাংশ। কিছু পরিবেশে এই হার আরও কমেছে বলেও উল্লেখ আছে।

অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে এই সিস্টেম এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে তাকে অব্যর্থ ভবিষ্যদ্বক্তা বলা যায়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, মানুষেরা মেশিনকে যতই ভবিষ্যদ্বক্তা ভাবতে শুরু করে, ততই তার ভুলকে কম প্রশ্ন করে। ৬০ শতাংশ সাফল্য পরীক্ষাগারে একরকম সংখ্যা, কিন্তু বোমারু বিমানের ছায়ায় সেটি অন্য অর্থ পায়। সেখানে বাকি ৪০ শতাংশ কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; সেটি হতে পারে ভুল মানুষ, ভুল ঘর, ভুল জীবন।

এখানেই আসে কগনিটিভ অফলোডিংয়ের প্রসঙ্গ। মানে বিশ্লেষণ, তুলনা, প্রাথমিক সিদ্ধান্ত, প্যাটার্ন চেনা, সন্দেহ তোলা—মস্তিষ্কের এই কাজগুলো ধীরে ধীরে অ্যালগরিদমের হাতে তুলে দেওয়া। গবেষক ও বিশ্লেষকেরা বহুদিন ধরে বলে আসছেন, এআই যদি দীর্ঘ দিন ধরে এই বিশ্লেষণাত্মক কাজ করতে থাকে, তবে মানব-অপারেটরদের নিজেদের ভুল ধরার ক্ষমতা ক্ষয়ে যেতে পারে। মানুষ ভাবতে শুরু করে, মেশিন যখন দেখেছে, নিশ্চয়ই ঠিকই দেখেছে। এটিই হলো অটোমেশন বায়াসের যুদ্ধসংস্করণ।

আগে মানুষ মানচিত্রে চোখ বুলিয়ে ভুল করত, এখন মানুষ স্ক্রিনে ভেসে ওঠা আত্মবিশ্বাসী সুপারিশের সামনে মাথা নোয়ায়। আগের ভুল ছিল মানবিক, এখনকার ভুল প্রযুক্তিনির্ভর; ফলে তা আরও নিরীহ দেখায়। কিন্তু নিরীহ দেখানো আর নিরীহ হওয়া এক কথা নয়।

যুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কমে আসছে, এটাকেই অনেকেই ডিসিশন কম্প্রেশন বলেন। আগে একটি হামলার আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনো দিন, কখনো তার চেয়েও বেশি সময় ধরে আলোচনা, যাচাই, বিরোধিতা, মন্থরতা, নৈতিক অস্বস্তি, গোয়েন্দা ব্যাখ্যা, মাঠ-রিপোর্ট, কমান্ড চেইন—সব মিলিয়ে একধরনের ঘর্ষণ ছিল। যুদ্ধের পক্ষে সেই ঘর্ষণ বিরক্তিকর হতে পারে, কিন্তু মানুষের পক্ষে সেটাই কখনো কখনো শেষ প্রতিরোধ। এআই এসে সেই ঘর্ষণ কমায়। একে সামরিক ভাষায় গতি বলা হয়, আর নীতির ভাষায় একে বলা যায় বিবেকের সংকোচন।

হ্যামলেটের যুগে মানুষ প্রশ্ন করত, অস্তিত্ব থাকবে, নাকি থাকবে না। আর এআই-যুদ্ধের যুগে প্রশ্নটা যেন যাচাই করব, নাকি করব না। আর যেহেতু যুদ্ধক্ষেত্রে সব সময় তাড়া থাকে, তাই উত্তর আসে; পরে দেখা যাবে। কিন্তু পরে সাধারণত কিছুই দেখা যায় না, শুধু ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়।

আরেকটি জিনিস লক্ষণীয়। পেন্টাগন, প্রতিরক্ষা ঠিকাদার, এআই কোম্পানি, নৈতিকতাবিষয়ক জনসংযোগ, আদালত, বাজার—সব একসঙ্গে জড়িয়ে গেছে। একদিকে অ্যানথ্রপিক নীতিগত সীমা টানতে চাইছে বলে দাবি করেছে, আবার পেন্টাগন সেটিকে নিজেদের কাজের বাধা হিসেবে দেখছে। ওপেনএআই সব বৈধ উদ্দেশ্যের জন্য বিস্তৃত ভাষার সুযোগ নিয়ে যুদ্ধের দরজা খুলে দিয়েছে বলে প্রতিবেদন এসেছে। ঠিকাদারেরা বিকল্প মডেল খুঁজছে, অথচ যুদ্ধের ময়দানে ইতিমধ্যেই এআই চালু হয়ে গেছে। অবস্থাটা এমন, যেন মহাভারতের যুদ্ধ শুরুর পর সভায় বসে অস্ত্রের ব্যবহারবিধি নিয়ে কমিটি গঠন করা হচ্ছে!

এই বৈপরীত্যটি বোঝা জরুরি। কারণ, প্রযুক্তির নৈতিক সীমারেখা যুদ্ধ শুরুর আগে না টানলে, যুদ্ধের ডামাডোলে তা প্রায় সর্বদাই পায়ের দাগে মুছে যায়। বিপদটি তাই শুধু এই নয় যে এআই যুদ্ধকে দ্রুততর করেছে; এআইয়ের আসল বিপদ হলো, এটি মানুষকে আরও বেশি দায়হীন করে তুলতে পারে।

এ ক্ষেত্রে দায় এড়ানোর এক মহোৎসব দেখা যেতে পারে। কমান্ডার হয়তো বলবেন, সিস্টেমটি অগ্রাধিকার দিয়েছিল; অপারেটর বলবেন, অনুমোদন ওপরমহল থেকে এসেছে; কোম্পানি বলবে, তারা শুধু একটি টুল তৈরি করেছে; আর সরকার হয়তো বলবে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তো মানুষই নিয়েছে! অ্যালগরিদম অবশ্য কিছুই বলবে না। এভাবেই দায়িত্ববোধ কুয়াশার মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর মানবিকতার সবচেয়ে বড় বিপর্যয় অনেক সময় শুধু হত্যার মধ্যে থাকে না; হত্যার পর এটা ‘আমার সিদ্ধান্ত নয়’ বলে দায় এড়ানোর যে ভদ্রতা-মাখা শূন্যতা তৈরি হয়, তার মধ্যেই থাকে।

গাজা ও ইউক্রেন যুদ্ধে এআইয়ের উপস্থিতি ছিল। ইরানে এসে মনে হচ্ছে, এআই আর নেপথ্য চরিত্র নেই, বরং কুশীলবদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। তবু এআই যুদ্ধ চালাচ্ছে কথাটা আক্ষরিক অর্থে বলা হয়তো ঠিক হবে না; কারণ, অস্ত্র এখনো মানুষই চালায়, রাষ্ট্রই সিদ্ধান্ত নেয়, কমান্ড চেইনও রয়ে গেছে। কিন্তু এটুকু বলা ন্যায্য যে এআই এখন যুদ্ধের তাল, গতি, বাছাই, প্রাথমিক বিচার এবং অনুমোদনের পরিবেশ এমনভাবে তৈরি করছে যে মানুষ সেখানে ক্রমশ পরিচালকের বদলে শুধুই সাক্ষী হয়ে উঠছে।

সেই কারণেই উদ্বেগটা শুধু প্রযুক্তিগত নয়; বরং নৈতিক, রাজনৈতিক এবং সভ্যতাগত। যুদ্ধ বরাবরই মানুষকে পশু করে। এআই-যুদ্ধের সম্ভাব্য সর্বনাশ হলো, এবার মানুষ পশু না হয়েও পশুত্বকে আরও সুশৃঙ্খল করতে শিখছে!

লেখক: সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, এ. আই. বিহেভিয়োরাল রিসার্চার


Share:

Single Page