ছোটবেলা থেকেই ইতিহাসের প্রতি এক তীব্র আকর্ষণ ও কৌতুহলের কারণে হাজার পৃষ্ঠার মোটা মোটা বইয়ের পাতায় ডুব দিয়ে থাকার অভ্যাস ছিল অনেকের। তেমনই এক ঈদের বাজারে শফীউদ্দীন সরদারের ‘বারো ভূঁইয়ার উপাখ্যান’ পড়তে গিয়ে জানা যায় এক চমকপ্রদ তথ্য।
মসনদে আলা ঈশা খাঁর দ্বিতীয় রাজধানীটি নাকি একেবারে ঘরের কাছে, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার নরসুন্দা নদীর পাড় ঘেঁষেই অবস্থিত। প্রতিদিন কুফা ও মফস্বল শহরের যাতায়াতের পথে সিএনজি বা অটোচালকদের মুখে ‘জঙ্গলবাড়ি-জঙ্গলবাড়ি’ ডাক শোনা গেলেও, এর আড়ালে যে এক হার-না-মানা মহাবীরের ইতিহাস লুকিয়ে আছে, তা অনেকেরই অজানা।
রমজানের এক কুয়াশামাখা ভোরে কিশোরগঞ্জ থেকে তারাবি পড়াতে আসা হাত্রাপাড়া গ্রামের কয়েকজন তরুণকে সঙ্গে নিয়ে পায়ে হেঁটে শুরু হয় সেই ঐতিহাসিক জঙ্গলবাড়ি দুর্গ অভিমুখে যাত্রা।
যাওয়ার মেঠোপথ ধরে এগোতেই একসময় প্রাচীন রাজপথের ভাঙা ইট-সুরকি চোখে পড়ে, যা দেখে মনে পড়ে যায় ১৫৮৫ সালের সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। সে সময় মসনদে আলা ঈশা খাঁ কোচ রাজা লক্ষ্মণ হাজরা ও রাম হাজরাকে পরাজিত করে এই জঙ্গলঘেরা দুর্গ দখল করেছিলেন।
যাওয়ার মেঠোপথ ধরে এগোতেই একসময় প্রাচীন রাজপথের ভাঙা ইট-সুরকি চোখে পড়ে, যা দেখে মনে পড়ে যায় ১৫৮৫ সালের সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। সে সময় মসনদে আলা ঈশা খাঁ কোচ রাজা লক্ষ্মণ হাজরা ও রাম হাজরাকে পরাজিত করে এই জঙ্গলঘেরা দুর্গ দখল করেছিলেন।
১৫২৯ সালের ১৮ আগস্ট জন্ম নেওয়া এই বীর মোগল ও ইংরেজদের হাত থেকে বাংলাকে রক্ষা করতে বারো ভূঁইয়াদের নেতৃত্ব দেন এবং ১৫৯৭ সালে মোগল সেনাপতি মানসিংহকে পরাজিত করে বাংলার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখেন।
দিল্লির রাজসিংহাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী সুলতান দাউদ কররানীকে সাহায্য করায় বা সম্রাট আকবরের কাছ থেকে তিনি ‘মসনদে আলা’ উপাধি পান। ত্রিপুরা রাজ্যের রাজা চাঁদ রায়ের কন্যা স্বর্ণময়ী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পর তার নাম রাখা হয় সোনাবিবি, আর এই প্রিয়তমা স্ত্রীর নাম অনুসারেই ঈশা খাঁ বাংলার রাজধানীর নামকরণ করেছিলেন ‘সোনারগাঁও’।
দুর্গের সিংহদ্বারে পৌঁছালে দেখা মেলে এক অপূর্ব নিঝুম পরিবেশের। প্রায় ৪০ একর জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই দুর্গের তিনদিকে পরিখা খনন করে নরসুন্দা নদীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। দুর্গের ভেতরে মোগল স্থাপত্যশৈলীর ছাপ সংবলিত তিনটি গম্বুজ ও চারটি মিনার বিশিষ্ট ৪৪ ফুট দীর্ঘ একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ রয়েছে, যেখানে এখনও নিয়মিত নামাজ হয়।
দুর্গের সিংহদ্বারে পৌঁছালে দেখা মেলে এক অপূর্ব নিঝুম পরিবেশের। প্রায় ৪০ একর জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই দুর্গের তিনদিকে পরিখা খনন করে নরসুন্দা নদীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। দুর্গের ভেতরে মোগল স্থাপত্যশৈলীর ছাপ সংবলিত তিনটি গম্বুজ ও চারটি মিনার বিশিষ্ট ৪৪ ফুট দীর্ঘ একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ রয়েছে, যেখানে এখনও নিয়মিত নামাজ হয়।
পাশে কিছু পুরোনো কবর থাকলেও ইতিহাস অনুযায়ী ঈশা খাঁ ১৫৯৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের বক্তারপুর দুর্গে মারা যান এবং সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়। বর্তমানে জঙ্গলবাড়ির ভেতরের দরবারঘরটি সংস্কার করে ‘ঈশা খাঁ স্মৃতি জাদুঘর ও পাঠাগার’ করা হয়েছে, যেখানে রয়েছে বীর ঈশা খাঁর ছবি ও তার বংশধরদের তালিকা।
এই দুর্গে সর্বশেষ বসবাস করে গেছেন ঈশা খাঁর চতুর্দশ বংশধর দেওয়ান ফতেহ আলী দাদ খাঁ, যিনি ২০১৩ সালে মারা যান এবং বর্তমানে তার পরিবার শহরের রথখলা এলাকায় বসবাস করছেন। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ঐতিহাসিক এই দুর্গটি দ্রুত সংস্কারের আশ্বাস দিয়েছে, যা আমাদের অতীত গৌরবকে আগামী প্রজন্মের কাছে জীবন্ত করে রাখবে।