১৮৮৬ সালে শিকাগোর হে মার্কেটে আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টার দাবিতে যে রক্ত ঝরানো আন্দোলন হয়েছিল, সেই আন্দোলনের ফসল আজকের ‘মে দিবস’। আজ বিশ্বজুড়ে শ্রমিকেরা এই দিনটি পালন করছেন উন্নত কর্মপরিবেশ আর ন্যায্য মজুরির অঙ্গীকার নিয়ে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মে দিবস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ আমাদের দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার মূল কারিগরই হলেন আমাদের শ্রমিক শ্রেণি। তবে প্রায় সার্ধশতবর্ষ আগের সেই সংগ্রামের মূল চেতনা—অর্থাৎ শ্রমের মর্যাদা ও সুরক্ষা—বাংলাদেশে কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, তা আজ গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো পোশাক শিল্প এবং প্রবাসী আয়। এই দুটি খাতের পেছনেই রয়েছে লাখ লাখ শ্রমিকের হাড়ভাঙা খাটুনি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, যে শ্রমিকেরা দেশের অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে দিচ্ছেন, তাদের জীবনযাত্রার মান এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিম্নমুখী। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আবাসন সংকটের চাপে শ্রমিকের প্রকৃত আয় আজ সংকুচিত। ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নির্দিষ্ট করা হলেও, তা অনেক ক্ষেত্রেই বর্তমান বাজারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
গত এক দশকে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি বা তাজরীন ফ্যাশনসের মতো দুর্ঘটনার পর পোশাক শিল্পে কর্মপরিবেশের উল্লেখযোগ্য সংস্কার হয়েছে সত্য। তবে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের চিত্র এখনো অন্ধকারাচ্ছন্ন। নির্মাণ শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক কিংবা পরিবহন শ্রমিকদের জন্য আজও কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বা বীমা ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি। দেশের একটি বিশাল অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যুক্ত থাকায় তারা শ্রম আইনের পূর্ণ সুবিধা থেকেও বঞ্চিত। কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
২০২৬ সালের এই প্রযুক্তিনির্ভর যুগে শ্রমবাজারের ধরণ বদলে যাচ্ছে। গিগ ইকোনমি বা ফ্রিল্যান্সিং শ্রমের নতুন মাত্রা যোগ করলেও এই খাতের কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষা বা আইনি স্বীকৃতির অভাব রয়েছে। অন্যদিকে, শিল্পখাতে অটোমেশনের প্রভাবে অনেক অদক্ষ শ্রমিক কাজ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। মে দিবসের এই লগ্নে শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রে শ্রমিকের অধিকার কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্ক এবং কার্যকর ত্রিপক্ষীয় (সরকার, মালিক, শ্রমিক) আলোচনার মাধ্যমে মজুরি বৈষম্য দূর করা প্রয়োজন। শ্রম আইনকে আরও আধুনিকায়ন এবং এর কঠোর বাস্তবায়ন প্রয়োজন। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
শ্রমিক কেবল উৎপাদনের হাতিয়ার নয়, তারাও মানুষ। তাদের ঘামেই গড়ে ওঠে সভ্যতার অট্টালিকা। মে দিবসের সার্থকতা কেবলমাত্র তখনই আসবে, যখন একজন শ্রমিক মাস শেষে সম্মানজনক মজুরি নিয়ে হাসিমুখে ঘরে ফিরতে পারবেন এবং তার সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হবে। শিকাগোর সেই আন্দোলনের চেতনা যেন কেবল মে মাসের এক তারিখেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বছরের ৩৬৫ দিনই শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষায় আমাদের অঙ্গীকার অটুট থাকে—এটাই হোক আজকের মে দিবসের প্রতিজ্ঞা।