দেশে গ্যাস সংকট নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রায় এক দশক ধরেই এটি একটি পরিচিত সমস্যা, যা শীত মৌসুম এলেই আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তবে চলতি মৌসুমে পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি উদ্বেগজনক। কারণ এবার পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাস সংকটের পাশাপাশি হঠাৎ করে যুক্ত হয়েছে এলপিজির মারাত্মক ঘাটতি। এই দ্বিমুখী জ্বালানি সংকটে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং শীতকালীন চাপ প্রতিবছরের মতোই। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাস না থাকা, গভীর রাত বা ভোরে স্বল্প সময়ের জন্য গ্যাস পাওয়া এবং এর পরও পুরো মাসের বিল আদায়—সব মিলিয়ে স্পষ্ট হয়, এটি কেবল মৌসুমি সমস্যা নয়; বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার ঘাটতির ফল।
এই অবস্থার মধ্যে এলপিজি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সরকার যেখানে দায় চাপাচ্ছে ব্যবসায়ীদের কারসাজির ওপর, সেখানে খুচরা বিক্রেতারা দোষ দিচ্ছেন আমদানিকারকদের। কিন্তু এই দায় ঠেলাঠেলির রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা। অনেক এলাকায় এলপিজি সিলিন্ডারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, আবার কোথাও টাকা দিয়েও সিলিন্ডার মিলছে না। বাজার তদারকিতে এই ব্যর্থতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক অবস্থা তৈরি হয়েছে এলপিজি অটোগ্যাস খাতে। দেশের ৬৪ জেলায় স্থাপিত প্রায় এক হাজার অটোগ্যাস স্টেশন কার্যত বন্ধের মুখে। অথচ মোট ব্যবহারের মাত্র ১০ শতাংশ—প্রায় ১৫ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি—যানবাহন খাতে সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলেই এই খাত সচল রাখা সম্ভব। এত সামান্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে না পারা জ্বালানি খাতের পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকারের ওপর গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
আবাসিক খাতে ভোগান্তি আরও গভীর হয়েছে। অনেক পরিবার গ্যাস না পেয়ে বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছে, এতে বিদ্যুতের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষ আবার মাটির চুলা বা অন্যান্য অস্বাস্থ্যকর বিকল্পের দিকে ঝুঁকছেন, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ—দুয়ের জন্যই ক্ষতিকর। গ্যাস না পেলেও নিয়মিত মাসিক বিল পরিশোধের বাধ্যবাধকতা গ্রাহকসেবার নামে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যেরই প্রতিফলন।
সরকারি সংস্থাগুলো বলছে, পাইপলাইনের গ্যাস সংকট ও এলপিজি সংকট আলাদা বিষয়। কারিগরি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি আংশিক সত্য হলেও ভোক্তার কাছে জ্বালানি একটাই—রান্না, যাতায়াত ও জীবিকার জ্বালানি। একটি খাতে সংকট তৈরি হলে অন্য খাতে চাপ পড়বেই। এই সমন্বয়হীনতার দায় নীতিনির্ধারকদের এড়ানোর সুযোগ নেই।
পাইপলাইনের গ্যাস সংকট সমাধানে বড় বিনিয়োগের কথা বলা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এই প্রয়োজন কি হঠাৎ করে তৈরি হয়েছে? নদীর তলদেশে থাকা পাইপলাইন ঝুঁকিপূর্ণ—এ তথ্য বহুদিন ধরেই জানা। তবুও আগাম সংস্কার, বিকল্প রুট বা জরুরি পরিকল্পনা কেন নেওয়া হয়নি, সেই জবাব এখনো স্পষ্ট নয়।
এই সংকট থেকে উত্তরণে দায় এড়ানোর সংস্কৃতি পরিহার করতেই হবে। এলপিজি আমদানিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, মজুদ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় কার্যকর রাষ্ট্রীয় নজরদারি, বিইআরসি নির্ধারিত দামের কঠোর বাস্তবায়ন এবং পাইপলাইন গ্যাসে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ—সবকিছু একসঙ্গে বাস্তবায়ন না করলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।
জ্বালানি কোনো বিলাসপণ্য নয়; এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। সেই প্রয়োজন পূরণে ব্যর্থতা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি। এখনই কার্যকর ও সমন্বিত সিদ্ধান্ত না নিলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর হবে—এর দায় এড়ানোর সুযোগ কারও নেই।