ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছেন মামলার প্রধান সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদ। তবে এই ভিডিও বার্তাকে তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিচ্ছে না ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিবির দাবি, পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ ও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই ফয়সালকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে।
গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ছয়জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। গ্রেপ্তারদের তালিকায় ফয়সাল করিম মাসুদের বাবা মো. হুমায়ুন কবির, মা মোছাম্মৎ হাশি বেগম, স্ত্রী সাহেদা পরভিন সামিয়াসহ পরিবারের সদস্য ও সহযোগীরা রয়েছেন।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ফয়সাল ভিডিওতে কী দাবি করেছেন, তা তদন্তের মূল বিষয় নয়। এমনকি ভিডিওটি কৃত্রিমভাবে তৈরি কি না, সেটিও যাচাইয়ের বাইরে নয়। তিনি বলেন, “হাদি হত্যাকাণ্ডে ফয়সাল মূল অভিযুক্ত। তার জড়িত থাকার বিষয়ে আমাদের কাছে নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য, তথ্যপ্রমাণ ও স্বীকারোক্তি রয়েছে। তার মা, বাবা, স্ত্রী ও প্রেমিকা আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। এ ছাড়া সীমান্ত এলাকায় তাকে পৌঁছে দেওয়া চালকের সাক্ষ্যও আমাদের কাছে রয়েছে।”
ডিবির পক্ষ থেকে ভিডিওটি এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি হতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করা হলেও ডিজিটাল অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম দ্য ডিসেন্ট তাদের বিশ্লেষণে জানিয়েছে, ভিডিওটি পুরোপুরি এআই-নির্ভর নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভিডিওতে ফয়সালের মুখভঙ্গি, অভিব্যক্তি ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য বাস্তব চেহারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ, আলো ও ফ্রেম বিশ্লেষণসহ একাধিক এআই যাচাই টুল ব্যবহার করে তারা নিশ্চিত হয়েছে—ভিডিওটি কৃত্রিমভাবে নির্মিত নয়।
তবে বিশ্লেষণে আরও উল্লেখ করা হয়, ভিডিওর কিছু অংশে ফয়সালের বিশেষ এক মুখভঙ্গির সময় তার থুতনির দাড়ি অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, ভিডিও ধারণের সময় ব্যবহৃত একটি ফিল্টারের কারণেই এমনটি হয়েছে। যদিও ওই ফিল্টারে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার থাকতে পারে, তবে সেটিকে পুরো ভিডিও এআই-সৃষ্ট বলে প্রমাণ করার যথেষ্ট ভিত্তি নেই।
ভিডিও বার্তায় ফয়সাল দাবি করেন, তিনি বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করছেন। তবে শুধুমাত্র ভিডিও দেখে তার অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ভিডিওতে বা অন্য কোনো মাধ্যমে তিনি তার অবস্থান সংক্রান্ত দৃশ্যমান প্রমাণও উপস্থাপন করেননি।
এ ছাড়া ভিডিওতে তিনি বলেন, হাদি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলে তিনি ছিলেন না। কিন্তু দ্য ডিসেন্ট-এর আগের অনুসন্ধানে উঠে আসে ভিন্ন তথ্য। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলে ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর শেখ উপস্থিত ছিলেন। বাইকের পেছনে বসে গুলিবর্ষণ করেন ফয়সাল এবং মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন আলমগীর শেখ। এই তথ্য পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তেও মিলেছে।
ভিডিও বার্তায় ফয়সাল বলেন, “আমি ফয়সাল করিম মাসুদ। গত ১২ ডিসেম্বর ওসমান হাদি নামে একজনের হত্যাকাণ্ডের মামলায় আমাকে আসামি করা হয়েছে। কিন্তু আমি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনোভাবেই জড়িত নই।”
উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে নির্বাচনী প্রচারণা শেষে ফেরার পথে ঢাকার ৮ নম্বর আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং রাজনৈতিক আন্দোলন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হন। প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।