রামিসা হত্যা মামলা: আদালতে সাক্ষীদের জবানবন্দিতে উঠে এলো সেই বিভীষিকাময় বর্ণনা
ঢাকা: রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন নিহতের বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। তাদের জবানবন্দিতে ১৯ মে-র সেই ভয়াবহ ও লোমহর্ষক ঘটনার চিত্র ফুটে উঠেছে।
মঙ্গলবার (২ জুন) ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে ভুক্তভোগীর বাবা-মা ও বড় বোনসহ মোট ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। সাক্ষ্যদাতারা রামিসার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার, অভিযুক্ত সোহেল রানার পালিয়ে যাওয়া এবং ঘটনার পর ফ্ল্যাটের ভেতরের রোমহর্ষক পরিস্থিতির বিবরণ দেন।
বাবা হান্নান মোল্লার সাক্ষ্য
মামলার বাদী ও রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা আদালতে জানান, ঘটনার দিন সকালে তিনি কাকলীতে তার অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হন। সকাল ১০টা থেকে ১০টা ১৫ মিনিটের মধ্যে তার স্ত্রী পারভীন আক্তার অত্যন্ত জরুরিভিত্তিতে তাকে বাসায় ফিরতে বলেন।
"ফোন পেয়ে ২৫-৩০ মিনিটের মধ্যে আমি বাসায় পৌঁছাই। গিয়ে দেখি ফ্ল্যাটের সামনে প্রচুর মানুষ। আমার স্ত্রী পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় অনবরত ধাক্কা দিচ্ছিল, কিন্তু ভেতর থেকে কেউ সাড়া দিচ্ছিল না। পরে আমি হাতুড়ি দিয়ে লক ভেঙে ভেতরে ঢুকি এবং টয়লেটের সামনে রক্তের দাগ দেখতে পাই।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ঘটনার আগে তিনি আসামিদের কখনোই দেখেননি বা চিনতেন না।
মা পারভীন আক্তারের আর্তনাদ
রামিসার মা পারভীন আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে আদালতকে বলেন, ঘটনার সময় তিনি রান্না করছিলেন। হঠাৎ একটি চিৎকার শুনেছিলেন, তবে ভেবেছিলেন পাশের বাসার কোনো শিশু হয়তো কাঁদছে। রান্নার শেষে ছোট মেয়ে রামিসাকে না পেয়ে তিনি খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।
ভবনের বিভিন্ন স্থানে খোঁজার একপর্যায়ে তৃতীয় তলায় প্রতিবেশী স্বপ্নার ফ্ল্যাটের সামনে রামিসার একটি জুতো পড়ে থাকতে দেখেন। তখন তার সন্দেহ হয় যে চিৎকারটি তার মেয়েরই ছিল।
পারভীন আক্তার বলেন, "আমি বারবার স্বপ্নাকে বোন বলে ডেকে দরজা খুলতে বলেছিলাম, কিন্তু সে খোলেনি।" পরে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার পর অভিযুক্ত স্বপ্না আক্তার উপস্থিত লোকজনের সামনে স্বীকার করে যে, সোহেল রানা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পালিয়ে গেছে।
স্বজন ও প্রতিবেশীদের বয়ানে নৃশংসতার চিত্র
আদালতে রামিসার চাচা, চাচি ও প্রতিবেশীদের সাক্ষ্যে হত্যাকাণ্ডের চরম নৃশংসতা প্রকাশ পায়:
রামিসার চাচি: তিনি জানান, ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢুকে খাটের নিচে রামিসার রক্তাক্ত ও মাথাবিহীন মরদেহ দেখতে পান।
চাচা মিজানুর রহমান লিটন: তিনি বলেন, "বাসায় এসে দেখি চারদিকে রক্ত। একটি বড় বালতির ভেতরে রামিসার বিচ্ছিন্ন মাথা রাখা ছিল। তার গলা ও হাত কাটা ছিল।" তিনি আদালতে উপস্থিত আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুনকে শনাক্ত করেন।
প্রতিবেশী মনির হোসেন ও জাকিরুল ইসলাম: তারা জানান, দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার পর প্রথম দিকে স্বপ্না কিছু না জানার ভান করে দাঁড়িয়ে ছিল। পরে ঘরের ভেতরের আরেকটি তালাবদ্ধ গেট খুলে এবং খাট উঁচু করে রামিসার বস্ত্রহীন ও ক্ষতের সৃষ্টি হওয়া মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী আবু সামা: তিনি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। ঘটনার দিন সকাল ১০টার দিকে নাস্তা করার সময় তিনি পাশের বাসার জানালা বেয়ে এক ব্যক্তিকে খালি গায়ে নিচে নামতে দেখেন। প্রথমে চোর ভাবলেও পরে মিডিয়ার ছবি দেখে তিনি নিশ্চিত হন যে, জানালা দিয়ে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিটিই মূলত মূল আসামি সোহেল রানা।
সাক্ষী মনিরুজ্জামান শাহীন: তিনি ঘটনাস্থলে একটি পাতলা ছুরি এবং বালতিতে রামিসার মাথা দেখার কথা জানান। এছাড়া পুলিশ সদস্য রুমা আক্তারও আদালতে এই মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর বক্তব্য
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুল রহমান দুলু সাংবাদিকদের জানান, সাক্ষীদের বক্তব্যে মামলার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষ করে শিশুটির বাবা-মায়ের জবানবন্দিতে ঘটনার যে বিবরণ এসেছে তা অত্যন্ত লোমহর্ষক। এছাড়া আসামি সোহেল রানা ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর জানালার গ্রিল কেটে যেভাবে পালিয়ে গিয়েছিল, সাক্ষীদের মাধ্যমে তাও আদালতে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।