জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলায় সরিষার মাঠ-ঘাট হলুদ রঙের সরিষা ফুলে ভরে উঠেছে। চারদিকে মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের সঙ্গে সঙ্গে মৌচাষীদের জন্য শুরু হয়েছে ব্যস্ত সময়। সরিষা ক্ষেতের পাশে সারি সারি মৌবাক্স বসিয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন বিভিন্ন এলাকার মৌচাষীরা।
সরিষা ফুলের মধু মানসম্মত ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ হওয়ায় এর বাজারে চাহিদা তুলনামূলক বেশি। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মৌবাক্স থেকে মধু সংগ্রহ করছেন তারা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় চলতি মৌসুমে মধুর উৎপাদনও ভালো হচ্ছে বলে জানান মৌচাষীরা।
দিনাজপুর থেকে আসা মৌচাষী সোহেল রানা বলেন, “আমরা এর আগে নওগাঁতে ছিলাম। পাঁচবিবিতে সরিষার আবাদ ভালো হওয়ায় এখানে এসেছি। শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে শুরুতে মৌমাছিগুলো ঠিকমতো বাক্স থেকে বের হচ্ছিল না। এতে মধু সংগ্রহ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। তবে বর্তমানে রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ায় মৌমাছিরা সরিষা ক্ষেতে গিয়ে মধু সংগ্রহ করে বাক্সে নিয়ে আসছে। আশা করি সামনে আরও ভালো উৎপাদন হবে। বর্তমানে প্রতিটি মৌবাক্স থেকে গড়ে ৮ থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত মধু পাওয়া যাচ্ছে এবং খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মধু ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।”
অপর মৌচাষী হাবিবুল্লাহ মিজান বলেন, “সরিষা ক্ষেতে আমরা ২০০টি মৌবাক্স বসিয়েছি। মধু উৎপাদনে অনেক টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু মধু বিক্রির সময় অনেক সময় ক্রেতা পাওয়া যায় না। কিছু পাইকার থাকলেও তারা ন্যায্য দাম দিতে চায় না। এতে প্রায়ই ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। সরকারি উদ্যোগে যদি মধু সংগ্রহ ও বিপণনের ব্যবস্থা করা হতো, তাহলে আমরা আরও আর্থিকভাবে উপকৃত হতাম।”
পাঁচবিবির নওদা এলাকার কৃষক রমিজ মন্ডল জানান, “সরিষা ক্ষেতে মৌবাক্স বসানোর ফলে আমাদের অনেক উপকার হচ্ছে। মৌমাছির কারণে পরাগায়ন ভালো হয়, ফলে সরিষার ফলন ১০–১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি পোকামাকড়ের উপদ্রবও কমে।”
মধু কিনতে আসা মৌসুমি বলেন, “আমি নিয়মিত এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করি। সরিষার জমি থেকে সরাসরি মধু সংগ্রহ করতে দেখে আগ্রহী হয়ে ৫০০ গ্রাম মধু কিনেছি। মধুটি খুবই খাঁটি ও ভালো মানের। প্রয়োজন হলে আবারও এখান থেকে মধু কিনবো।”
আরেক ক্রেতা আরাফাত বলেন, “বাজারে অনেক সময় ভেজাল মধু পাওয়া যায়। কিন্তু এখানে সরিষা ক্ষেতের পাশেই মৌবাক্স বসিয়ে প্রাকৃতিকভাবে মধু উৎপাদন করা হচ্ছে। তাই সরাসরি মাঠ থেকেই মধু কিনতে এসেছি।”
পাঁচবিবি উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মোঃ জসিম উদ্দিম বলেন, “গত বছর পাঁচবিবি উপজেলায় সরিষার উৎপাদন ছিল ৫,৭২৫ হেক্টর জমিতে। চলতি বছর ৭,১৪০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি। তেলজাতীয় ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের আওতায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের মাঝে মৌবাক্স সরবরাহ করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলায় প্রায় ৮৪০টি মৌবাক্স স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে ৪ জন মৌখামারি প্রায় ২৮০ কেজি মধু উৎপাদন করেছেন। সরিষা ক্ষেতে মৌবাক্স স্থাপনের ফলে পরাগায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সরিষার ফলন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করতে সহায়ক। মৌচাষ সম্প্রসারণে কৃষি বিভাগ নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করছে।”