পঞ্চগড় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি মনোরম জেলা। এখানে প্রকৃতির অবারিত সৌন্দর্য, বিস্তীর্ণ চা-বাগান, উর্বর কৃষিজমি ও শান্ত জীবনযাত্রার এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়। পঞ্চগড়ের মানুষের জীবন সরল এবং প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে আছে। এখানকার অর্থনীতি মূলত কৃষি, চা শিল্প ও পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। জেলার তেতুলিয়া থেকে বাংলাবান্ধা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে রয়েছে পাহাড়, নদী ও অনন্য প্রাকৃতিক দৃশ্য। বাংলাদেশের উত্তর দিকের শেষ জেলা হিসেবে পঞ্চগড় ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এক অপরিসীম প্রাকৃতিক অভিজ্ঞতা উপহার দেয়।
আমি, সজীব সাহা, বেসরকারি সংস্থা আশা-এর একজন শিক্ষা সুপারভাইজার। আমার সঙ্গে এই মনোরম ভ্রমণে ছিলেন বন্ধু ওমর ফারুক (মার্কেটিং পেশাজীবী), হৃদয় পাল (ব্যবসায়ী) এবং শামীম ইসলাম (ব্যবসায়ী)। আমরা সবাই প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু। ভ্রমণের কথা শুনলেই নিজেকে ধরে রাখতে পারি না। পুরো ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন বন্ধু ওমর ফারুক।
আমাদের যাত্রা শুরু হয় ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫, রাত ৯টায় ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে। সবাই শীতের পোশাক নিয়ে প্রস্তুত ছিলাম। পরদিন বুধবার সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে আমরা পঞ্চগড় রেলস্টেশনে পৌঁছাই। নামার সঙ্গে সঙ্গেই মনে হলো যেন বর্ষাকাল চলছে—চারদিক ঘন কুয়াশায় ঢাকা। আমরা মাফলার দিয়ে মুখ ঢেকে নাস্তা সেরে অটো ভাড়া করি। যাত্রা শুরু হয় তেতুলিয়া, কাঞ্চনজঙ্ঘা ও বাংলাবান্ধার উদ্দেশ্যে।
পঞ্চগড়ে সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো—এখানে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম অটো ও তিনচাকার ভ্যান। কারণ সন্ধ্যা ৬টার পর সিএনজি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
অটো চলতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই শীতের প্রকৃত অনুভূতি টের পাই। আমি জ্যাকেটের ওপর আরেকটি জ্যাকেট পরেছিলাম। মাঝপথে গাড়ি থামিয়ে রং চা খেয়ে শরীর গরম করি। এরপর পৌঁছাই তেতুলিয়া চা-বাগানে, যেখানে রাস্তার বাম পাশে মাত্র চার–পাঁচ হাত দূরেই ভারতের সীমানা। পরে যাই শিলিগুড়ি ব্রিজ ভিউ পয়েন্টে—মাঝখানে একটি নদী, তারপরই ভারত। কুয়াশায় ঢাকা ব্রিজটি যেন এক ভিন্ন জগতের দৃশ্য। আমরা কাঞ্চনজঙ্ঘা ভিউ পয়েন্টেও গিয়েছিলাম, কিন্তু কুয়াশার কারণে পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভব হয়নি।
তেতুলিয়া জেলা বাংলাদেশের উত্তর দিকের শেষ জেলা হলেও, উত্তরবঙ্গের একেবারে শেষ প্রান্ত হলো বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট। তেতুলিয়া থেকে বাংলাবান্ধা প্রায় ১২–১৫ কিলোমিটার, শিলিগুড়ি ১৬ কিলোমিটার, দার্জিলিং ৭৭ কিলোমিটার, গ্যাংটক ১৩৩ কিলোমিটার, সিকিম ১৫৪ কিলোমিটার, থিম্পু (ভুটান) ২৮৬ কিলোমিটার এবং কাঠমুন্ডু (নেপাল) ৪৯৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
বাংলাবান্ধায় পৌঁছে সূর্যের আলো পেয়ে এক অপার শান্তির অনুভূতি হয়। সেখানে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যায় বড় বড় পাথরবোঝাই ট্রাক, যা পরে ভেঙে ব্যবহারযোগ্য করা হয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর দৃশ্য হলো—বাংলাদেশের বিশাল জাতীয় পতাকা উড়ছে, যা চোখ জুড়িয়ে দেয়। প্রতিটি পর্যটন স্পটে পর্যটকদের আনাগোনা ও মুখরতা চোখে পড়ে।
পঞ্চগড়ের মানুষের জীবনযাত্রা অত্যন্ত সরল এবং প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। তারা মূলত কৃষি, চা শিল্প ও পর্যটন খাতের সঙ্গে যুক্ত। তেতুলিয়ার বিস্তীর্ণ চা-বাগান এখানকার অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। এখানকার মানুষ শান্ত, স্নিগ্ধ এবং পর্যটকদের প্রতি আন্তরিক আতিথেয়তায় ভরপুর। প্রতি বছর অসংখ্য পর্যটক কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য উপভোগ করতে এখানে আসেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে। পাশাপাশি স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির ছোঁয়াও চোখে পড়ে—উৎসব, স্থানীয় খাবার যেমন পিঠা ও পায়েস সকলের মন জয় করে।
পঞ্চগড় মানে শান্তি, প্রকৃতি ও অভিজ্ঞতার এক অপূর্ব সমন্বয়—যা আজীবন মনে রাখার মতো।
লেখা:
সজীব সাহা