বাংলাদেশের সংগীত অঙ্গনে নতুন প্রজন্মের যে কণ্ঠগুলো আলাদা করে চোখে পড়ে, তাদের মধ্যে তামান্না হক একটি উজ্জ্বল নাম। তিনি শুধু গান গেয়ে থেমে থাকেন না, বরং প্রতিটি গানে সময়, সমাজ আর ব্যক্তিগত অনুভূতির গল্প বুনে দেন। তার কণ্ঠে যেমন আছে মাটির গন্ধ, তেমনি আছে আধুনিক সাউন্ডের বিস্তার।
ঢাকার উপকণ্ঠে বেড়ে ওঠা তামান্নার সংগীতযাত্রা শুরু হয় খুব অল্প বয়সে। স্কুলজীবনেই গানের প্রতি তার গভীর অনুরাগ তৈরি হয়। ওস্তাদ আবু সাঈদ বিশ্বাসের কাছে তালিম নেওয়ার মধ্য দিয়ে সংগীতে আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু। পরে ওস্তাদ আবু নাসির চৌধুরীর কাছে শাস্ত্রীয় সংগীত ও লোকগানের দীক্ষা নেন। এর আগে শিশু একাডেমী থেকে নাচ শিখেছেন, টেলিভিশন নাটকেও কাজ করেছেন। কৈশোরের শেষদিকে এসে লোকগানের প্রতি তার বিশেষ টান তৈরি হয়। লালনের গান শুনে নিজের ভেতরের কথাই যেন খুঁজে পান তিনি।

মাত্র কয়েক বছরের ক্যারিয়ারে তামান্না হক নিজস্ব একটি ধারা তৈরি করেছেন। তার গানে বাংলা লোকসংগীতের শিকড় যেমন স্পষ্ট, তেমনি আধুনিক ইলেকট্রনিক সাউন্ডের ব্যবহারও চোখে পড়ে। 'আমি লিখলাম চিঠি ' প্রথম অ্যালবাম। 'চোখে বলে যেও না গো' মনির খান এর সাথে ডুয়েট। এই ফিউশন বিশেষ করে বিশ্বসংগীতপ্রেমীদের মধ্যে। এক আন্তর্জাতিক রিভিউতে তাকে “The Sufi Soul of South Asia” বলেও উল্লেখ করা হয়।
তামান্নার মতে, গান শুধু বিনোদন নয়, দায়বদ্ধতারও জায়গা। তিনি মনে করেন, একজন শিল্পীর নিজের সত্তার সঙ্গে আপস করা উচিত নয়। কনসার্টে তার নিজস্ব মৌলিক গানের সংখ্যা পঞ্চাশের বেশি। পাশাপাশি তিনটি চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেছেন ‘ইসা খাঁ’, ‘কিশোরী’ ও ‘বউ’। শ্রোতাদের পছন্দের গান পরিবেশনের পাশাপাশি নিজের মৌলিক কাজ নিয়েও তিনি সমানভাবে সক্রিয়।

২০১৮ সালে তার পেশাদার সংগীতজীবন শুরু হয়। ২০১৯ সালে ভারতের দীঘায় একটি প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে প্রথম বিদেশ সফর। এরপর আসাম, গুয়াহাটি, ত্রিপুরা, করিমগঞ্জ, আগরতলা, কলকাতা, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, রানাঘাট, উত্তর ২৪ পরগনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলা গান পরিবেশন করেন। ২০২২ সালে দুবাইয়ে পরপর চারটি কনসার্টে অংশ নেন এবং একটি সরকারি বিজয় উৎসবের আয়োজনে গান করেন। ২০২৪ সালে ইতালি ও প্যারিসে অনুষ্ঠান করেন; সেখানে তার পরিবেশিত “মাটি ও মন” গানটি ইউরোপীয় শ্রোতাদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। মালয়েশিয়াতেও একাধিকবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে পারফর্ম করলেও তামান্না নিজের শিকড়ের কথা ভুলে যান না। তার ভাষায়, তিনি যেখানেই যান, ভেতরে বাংলাদেশের সুরই বহন করেন। আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম আর শক্তিশালী লাইভ পারফরম্যান্স দিয়ে তিনি যেমন তরুণ শ্রোতাদের নাচিয়ে তুলতে পারেন, তেমনি গভীর, ধ্যানমগ্ন পরিবেশনায় আবেগী করে তুলতেও জানেন।
ঈদে নতুন গান হলো মশিউর রহমানের কথা ও সুরে এইচ আর লিটনের মিউজিক ‘বন্ধু তুমি কি চাও’। তামান্না হক এমন এক শিল্পী, যিনি দেশজ সংগীতকে বিশ্বমঞ্চের ভাষায় তুলে ধরতে চান। তার গান একদিকে ঐতিহ্যের ধারক, অন্যদিকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলা এক আধুনিক কণ্ঠস্বর। বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে তিনি ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় এক নাম, যিনি প্রতিটি সুরে নিজের গল্প আর সময়ের কথা বলে যেতে চান।