প্রবল ইচ্ছা আর অদম্য পরিশ্রম থাকলে যে কোনো বাধা ডিঙিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কুমিল্লার মুরাদনগরের সন্তান সৈয়দ মেহেদী হাসান। ৪৬তম বিসিএস পরীক্ষায় নিজের মেধা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে তিনি সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (প্রশাসন ক্যাডার) হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
শিক্ষাজীবনে মেধার স্বাক্ষর:
মুরাদনগরের যাত্রাপুর গ্রামের সৈয়দ এরশাদ মীরের মেজো ছেলে মেহেদী। তার সাফল্যের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে যাত্রাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বৃত্তি পাওয়ার মাধ্যমে। এরপর ২০১১ সালে যাত্রাপুর এ কে উচ্চ বিদ্যালয় থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে কুমিল্লা বোর্ডে মেধা তালিকায় স্থান করে নেন তিনি। উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ থেকে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও তিনি ছিলেন অনন্য। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ থেকে স্নাতক (Honors) পরীক্ষায় ৩.৭৮ এবং স্নাতকোত্তর (Masters) পরীক্ষায় ৩.৯৬ সিজিপিএ অর্জন করে 'ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট' হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
গবেষণার মাঠ থেকে বিসিএসের আঙিনায়:
পড়াশোনার এক পর্যায়ে মেহেদী হাসান বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই লক্ষ্যে তিনি দীর্ঘ দুই বছর নিরলস পরিশ্রম করে দেশি ও বিদেশি ৫টি স্বনামধন্য সায়েন্টিফিক জার্নালে নিজের গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। গবেষণায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি মর্যাদাপূর্ণ 'এনএসটি ফেলোশিপ' লাভ করেন। এর পাশাপাশি সমসাময়িক নানা বিষয়ে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখিও করতেন তিনি।

চার বছরের নিভৃতবাস ও রাজকীয় প্রত্যাবর্তন:
মেহেদীর এই সাফল্যের পথ সবসময় মসৃণ ছিল না। পারিবারিক এক আবেগঘন ঘটনার প্রেক্ষিতে তিনি দীর্ঘ ৪ বছর লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান। এই সময়টি তিনি ব্যয় করেন এক নিভৃত সাধনায়—নিজেকে গড়ার লড়াইয়ে। দীর্ঘ বিরতির পর যখন ফিরলেন, তখন এক নতুন পরিচয়ে। জীবনের প্রথম বিসিএস যুদ্ধেই তিনি প্রিলিমিনারি, লিখিত ও ভাইভাতে সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন।
মেহেদীর শৈশবের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যাত্রাপুর একে উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জনাব শফিকুল ইসলাম বলেন, সৈয়দ মেহেদী হাসান ২০১১ সালে যাত্রাপুর একে (আশরাফ কামিনী) উচ্চ বিদ্যালয়ের জিপিএ 5 পেয়ে এসএসসি পরীক্ষার পাস করে। ছাত্র হিসেবে সে শান্তশিষ্ট এবংখুবই মেধাবী ছিল। আমি ২০০৯ সালে এই স্কুলে আসি এবং এই ব্যাচ দিয়েই স্কুলে একটি রুম ব্যবহার করে রাতের বেলা শিক্ষকদেরকে নিয়ে টিচিং দেওয়া শুরু করি। স্বপ্ন ছিল ভালো রেজাল্ট, আশা করেছিলাম ওই বছর ৫ থেকে ৭জন এ প্লাস পাবে কিন্তু মেহেদী একমাত্র এ প্লাস পেয়েছিল আর বাকিরা কাছাকাছি, যাদের নাম মনে পড়ে তারা হল ইব্রাহিম, সুব্রত, সাদ্দাম, রমজান আলী, মাসুদুর রহমান সহ আরো অনেকেই। আমি আশা করছিলাম এই ব্যাচের ছাত্রগুলো তাদের নিজ নিজ অবস্থানে ভালো করবে কিন্তু আমার কাঙ্খিত ভালো কোন খবর পাই নাই, গতকালকে আমার প্রিয় ছাত্র মেহেদী তার কাঙ্খিত রেজাল্ট শোনানোর পর আমি এতই খুশি হয়েছিলাম যে আমার রাতের পরিশ্রম বৃথা যায়নি। আশা করছি সে একদিন ডিসি হবে সচিব হবে দেশে তার মেধার স্বাক্ষর রাখবে। যাত্রাপুরবাসী তথা দেশ তার কাছে অনেক কিছু পাবে। আল্লাহ তাকে সর্বোচ্চ অবস্থানে নিয়ে দেশের খেদমত করার জন্য তৌফিক দান করুক। আমিন।
আরেক শিক্ষক সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সৈয়দ মেহেদী হাসান আমার খুবই আদরের ছাত্র, এবং খুবই অভিডেন্ট। সে সব সময়ই আমার কথা,বক্তব্য ফলো করতো, এবং মেনে চলত।তার বাবা এরশাদ ভাই যখন সপরিবারে চট্রগ্রাম চলে যান, তখন যাবার সময় বলছিল ভাই জাহাঙ্গীর মেহেদীকে আল্লাহর রহমতে তোমার নিকট দিয়ে গেলাম একটু দেখিও। আমি তাদেরকে নিয়ে হোস্টেলে থাকি। আমার পরামর্শ ছিল, তার প্রতি এসএসসি, এইচএসসি পর্যন্ত শরীরে শুধু হাড্ডি থাকবে, একটা ভালো কিছুতে ভর্তি হলে তখন বলবে স্বাস্থ্য বেশী হয়ে গেছে কমাতে হবে।
সে আমার প্রতিটি পরামর্শ পাইটু পাই পালন করেছে। রেজাল্ট পাওয়ার সাথে সাথেই আমাকে ফোন দেন। এবং বিদায় অনুস্ঠানে তাকে আমি একমিনিটের মধ্যে বক্তব্য দেওয়ার কৌশল শিখিয় ছিলাম। এককথায় মেহেদী একজন অসাধারণ, বাধ্য, নম্র এবং ভদ্র ছেলে।আলহামদুলিল্লাহ, আমি তাহার শিক্ষক হিসেবে গর্বিত। তার জন্য দোয়া ও শুভকামনা সবসময়।
এক নজরে সৈয়দ মেহেদী হাসান:
পিতা: সৈয়দ এরশাদ মীর
ঠিকানা: গ্রাম: যাত্রাপুর, থানা: মুরাদনগর,
জেলা: কুমিল্লা।
অবস্থান: তিন ভাইয়ের মধ্যে মেজো।
সাফল্য: ৪৬তম বিসিএস (প্রশাসন ক্যাডার)।
সৈয়দ মেহেদী হাসানের এই বিজয় কেবল তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং এটি তরুণ প্রজন্মের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা। মেধা, ধৈর্য আর একাগ্রতা থাকলে জীবনের যেকোনো মোড় থেকেই ঘুরে দাঁড়িয়ে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো সম্ভব, সেটিই প্রমাণ করলেন মুরাদনগরের এই কৃতি সন্তান।+