মক্কা ও মদিনার পর ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান আল-আকসা মসজিদ আজ এক কঠিন অস্তিত্ব সংকটের মুখে। প্রায় ১,৪০০ বছর ধরে মুসলমানরা এই মসজিদে ইবাদত করে আসছেন এবং বর্তমানে আন্তর্জাতিক আইন ও ঐতিহাসিকভাবে এর তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব জর্ডানের হাশেমী রাজপরিবারের ওপর ন্যস্ত।
রাসুল (সা.)-এর বংশধারার ৪১তম উত্তরসূরি হিসেবে জর্ডানের বর্তমান বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে এই রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তবে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই পবিত্র স্থানটির ওপর কট্টর জায়নবাদী নেতৃত্বের শকুনি দৃষ্টি পড়ে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলের আগ্রাসী তৎপরতা শুধু বৃদ্ধিই পায়নি, বরং এর রূপ এখন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন ও বৃহত্তর সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০০০ সালে অ্যারিয়েল শ্যারনের প্ররোচনামূলক অভিযানের মধ্য দিয়ে আল-আকসা কমপ্লেক্স দখলের যে ধীরগতির তৎপরতা শুরু হয়েছিল, তা বর্তমানে ইতামার বেন গভিরের মতো উগ্রপন্থি নেতাদের মাধ্যমে চরম সীমায় পৌঁছেছে।
২০০০ সালে অ্যারিয়েল শ্যারনের প্ররোচনামূলক অভিযানের মধ্য দিয়ে আল-আকসা কমপ্লেক্স দখলের যে ধীরগতির তৎপরতা শুরু হয়েছিল, তা বর্তমানে ইতামার বেন গভিরের মতো উগ্রপন্থি নেতাদের মাধ্যমে চরম সীমায় পৌঁছেছে।
ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়মিত হস্তক্ষেপ, পবিত্র চত্বরে পুলিশ স্টেশন স্থাপন এবং মসজিদের অভ্যন্তরে গোলাগুলির ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে, তারা এর দীর্ঘস্থায়ী স্থিতাবস্থা (Status Quo) ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর। সম্প্রতি গণমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট আই’-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের তথ্য।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের পরিকল্পনায় জর্ডানকে আল-আকসার তত্ত্বাবধান থেকে সরিয়ে দেওয়ার ছক তৈরি করা হয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে মসজিদের ইমাম নিয়োগ, খুতবার বিষয়বস্তু নির্ধারণ এবং পুরো কমপ্লেক্সের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা চলে যাবে ইসরায়েলের হাতে, যা মুসলিম বিশ্বের জন্য চরম অপমানজনক ও অগ্রহণযোগ্য।
এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ এক ঐতিহাসিক অগ্নিপরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়েছেন। একদিকে যেমন রয়েছে ইসরায়েলের সামরিক শক্তি, অন্যদিকে নিজের সিংহাসন ও বিশ্বাসের জায়গা—আল-আকসা। সামরিক দিক থেকে ইসরায়েলকে সরাসরি পরাজিত করা জর্ডানের জন্য কঠিন হলেও, ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানে জর্ডানের হাতে রয়েছে শক্তিশালী তুরুপের তাস।
এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ এক ঐতিহাসিক অগ্নিপরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়েছেন। একদিকে যেমন রয়েছে ইসরায়েলের সামরিক শক্তি, অন্যদিকে নিজের সিংহাসন ও বিশ্বাসের জায়গা—আল-আকসা। সামরিক দিক থেকে ইসরায়েলকে সরাসরি পরাজিত করা জর্ডানের জন্য কঠিন হলেও, ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানে জর্ডানের হাতে রয়েছে শক্তিশালী তুরুপের তাস।
ইসরায়েলের সাথে জর্ডানের ৪০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে, যার সিংহভাগই দুর্গম পার্বত্য অঞ্চল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আল-আকসা নিয়ে সরাসরি সংঘাত বাধলে জর্ডান যদি প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তবে তা কেবল একটি সাধারণ যুদ্ধ হবে না, বরং এটি হবে এক দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা লড়াইয়ের সূত্রপাত, যা পুরো অঞ্চলের পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে।
জর্ডানের সাধারণ মানুষের মধ্যে গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার কারণে যে ক্ষোভ ও অপরাধবোধ জমা হয়েছে, তা যে কোনো সময় বড় ধরনের বিদ্রোহে রূপ নিতে পারে।
বাদশাহ আবদুল্লাহ যদি শেষ পর্যন্ত আল-আকসার সুরক্ষায় নতি স্বীকার না করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন, তবে তিনি শুধু জর্ডান নয়, বরং পুরো মুসলিম বিশ্বের সমর্থনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবেন।
বাদশাহ আবদুল্লাহ যদি শেষ পর্যন্ত আল-আকসার সুরক্ষায় নতি স্বীকার না করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন, তবে তিনি শুধু জর্ডান নয়, বরং পুরো মুসলিম বিশ্বের সমর্থনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবেন।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ এবং ইরানের সাথে আমেরিকার সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বাদশাহর এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েল যদি আল-আকসার স্থিতাবস্থা পরিবর্তন করে বা এর পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করার চূড়ান্ত ধৃষ্টতা দেখায়, তবে তা একটি দীর্ঘস্থায়ী ‘ধর্মযুদ্ধে’র দিকে মোড় নেবে।
এই লড়াই শুধু আল-আকসার সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা ছড়িয়ে পড়বে সৌদি আরব, ইরাক, সিরিয়াসহ পুরো মুসলিম বিশ্বে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাদশাহ আবদুল্লাহর প্রতিটি পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে হাশেমী রাজবংশের ভবিষ্যৎ এবং বিশ্বের দুই বিলিয়ন মুসলমানের ধর্মীয় ঐতিহ্যের সুরক্ষা।