শুধু মাত্র একটি যন্ত্রাংশের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে দেশের বৃহত্তর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার ক্যারেজ কোচ মেরামতের কাজ। আর সেটি হলো স্প্রিং। আমদানি নির্ভর এই স্প্রিং ছাড়াও আরও বেশ কিছু যন্ত্রাংশের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ফলে কারখানায় মেরামতের জন্য আসা কোচের বহর বাড়লেও যথাসময়ে সেগুলো আউটটার্ন দেয়া সম্ভব হচ্ছেনা।
মূলত: যন্ত্রাংশগুলো বাহির থেকে ক্রয় করার মাধ্যমে সংগ্রহে আমদানি কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে এই অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। আর বিগত সরকারের সময় আমদানির ক্ষেত্রে চরম দূর্নীতির খেসারত হিসেবে এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। যা প্রকট আকার ধারণ করার আশঙ্কায় ফেলেছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
কারখানা সূত্রে জানা যায়, কারখানার ভেতরের ইয়ার্ডে তিন মাস ধরে পড়ে আছে তিনটি ট্রেনের ৩০টি কোচ। স্প্রিং সংকটের কারণে কোচগুলো মেরামত করা যাচ্ছে না। প্রতিটি কোচ প্রায় ২ কোটি টাকা করে ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে খোলা জায়গায় পড়ে থাকায় কোচগুলোতে মরিচা ধরছে, নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রাংশও।
স্প্রিং আমদানিনির্ভর হওয়ায় দরপত্রের জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতায় এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিগত সরকারের সময় চাহিদা অনুযায়ী আমদানির দরপত্র হলেও সরবরাহের ক্ষেত্রে ঘাপলা করা হয়। অর্থাৎ অর্থ বরাদ্দ হলেও মালামাল পুরোপুরি না এনে ঠিকাদার, কর্মকর্তা ও সরকার দলীয় শ্রমিক নেতাদের যোগসাজশে বরাদ্দের অর্থ লোপাট করা হয়।
ফলে কোচের সংখ্যা অনুপাতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের মজুদ কম হয়েছে। এতে শুধু তিনটি কোচ নয়, মেরামতের অপেক্ষায় থাকা আরও কোচ নির্ধারিত সময়ে সার্ভিসিং করা যাচ্ছে না। ফলে দৈনিক মেরামতের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। ঢাকামূখী এক্সপ্রেস ট্রেনে সংযোজনের জন্যও অনেক কোচ মেরামতের অপেক্ষায়।
২০০৬ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ে ইন্দোনেশিয়া থেকে ৫০টি ব্রডগেজ কোচ আমদানি করে। এর মধ্যেই ছিল বরেন্দ্র এক্সপ্রেসে ব্যবহৃত এই তিনটি কোচ। প্রায় তিন মাস আগে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে সেগুলো মেরামতের জন্য সৈয়দপুরে পাঠানো হয়। কিন্তু স্প্রিংয়ের অভাবে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে বরেন্দ্র এক্সপ্রেস ট্রেনটি মাত্র ছয়টি কোচ নিয়ে চলাচল করছে, ফলে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছে।
রোববার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকালে কারখানার ইয়ার্ডে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কোচগুলোর ভেতরে ও বাইরে মরিচা ধরেছে, আশপাশে আগাছা গজিয়েছে। কারিগরি দপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ২০০৬ সালে আমদানি হওয়ার পর থেকে এসব কোচে আর স্প্রিং পরিবর্তন করা হয়নি।
রেলওয়ে কারখানার ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী শাহিনুর আলম শাহ বলেন, স্প্রিং কোচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এগুলো ক্ষয়প্রাপ্ত হলে চলাচলের সময় আগুন লাগার ঝুঁকিও থাকে। নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ বছর পরপর স্প্রিং বদলাতে হয়। কিন্তু বরেন্দ্র এক্সপ্রেসের ওই তিনটি কোচের স্প্রিং সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। স্প্রিং ছাড়াও চাকা, হুইপ, বেয়ারিং সরবরাহ না থাকায় সপে বগির লাইন বাড়ছে।
একটি সূত্র মতে, দেশে চলাচলরত ট্রেনগুলোর কোচের সংখ্যা অনুপাতে যন্ত্রাংশ মজুদ রাখতে হয়। সে অনুযায়ী যে যন্ত্রাংশগুলো বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়, সেগুলো ন্যুনতম বছর খানেক আগেই সংগ্রহ করা হয়। বিগত সরকারের সময় এই চাহিদা মাফিক টেন্ডার হলেও মালামাল সরবরাহ না করেই বিল তুলে নেয়া হয়েছে। এতে মজুদে ব্যাপক ঘাটতি হয়েছে।
বর্তমান সরকার আসার পর চাহিদা মাফিক যন্ত্রাংশ মজুদ না থাকায় নতুন করে টেন্ডার দিতে হচ্ছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় বিলম্ব হচ্ছে। যে কারণে গত এক বছরে মেরামতের জন্য আসা কোচগুলো প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের অভাবে যথাসময়ে সার্ভিসিং করা সম্ভব হচ্ছেনা।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার কর্ম ব্যবস্থাপক (ডাব্লিউ এম) মো. মমতাজুল হক বলেন, যে যন্ত্রাংশগুলোর সংকট সেগুলো আমদানী করতে ৬ মাস ১ বছর সময় লাগবে। এর আগে কারখানায় আসা কোচ মেরামত সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সুফী নুর মোহাম্মদ বলেন, স্প্রিং সংকটে কোচ মেরামত ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে, দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে একটা চিঠি মারফত আজই জানতে পেরেছি। আশা করি সংকট দূরীভূত হয়ে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা আবারও গতিশীল হবে।