মাদারীপুরে নারী কেলেঙ্কারি, ব্ল্যাকমেইল ও বালু সিন্ডিকেটে জড়িত থাকার অভিযোগ
মাদারীপুর জেলা এনসিপির সদস্য মেরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে—মামলা বাণিজ্য, নারীদের কুপ্রস্তাব, পরকীয়া, ব্ল্যাকমেইল, পুলিশ দিয়ে হয়রানি ও অবৈধ বালু ব্যবসা। ইতোমধ্যে ফাঁস হয়েছে তার অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অশ্লীল কথোপকথনের ভিডিও কল রেকর্ড ও ছবি, যা স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
এদিকে, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন, গোপন ছবি তুলে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা আদায় ও হুমকির অভিযোগে সেনাবাহিনীর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন এক ভুক্তভোগী নারী।
বিতর্কিত অতীত
মেরাজুল ইসলাম মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার শংকরদী গ্রামের ফার্নিচার পলিশ মিস্ত্রি সিরাজ বেপারীর ছেলে। এক সময় কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষক হিসেবে চাকরি করতেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টাকা আত্মসাৎ ও নারী কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকায় পরপর চারটি স্কুল—থ্রি-ডি ডিজিটাল স্কুল, ইকরা স্কুল, কিডস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ও মডেল স্কুল থেকে বহিষ্কার হন মেরাজুল। পরে ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর সুযোগ বুঝে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-তে যোগ দেন এবং জেলা সমন্বয় কমিটির সদস্য পদ দখল করেন। এর পর থেকেই পরিচালনা শুরু করেন অবৈধ বালু উত্তোলনের সিন্ডিকেট।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বালু বিক্রিতে বাধা দিলে হামলার ঘটনাও ঘটান তিনি। বর্তমানে রাজৈরের তাতিকান্দা, শংকরদী, হোসেনপুর ও পাইকপাড়া এলাকায় তার আধিপত্য বিস্তার করেছে।
ব্ল্যাকমেইল ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
গোপালগঞ্জ সদর থানায় মিথ্যা মামলা দিয়ে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে মেরাজুল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় ইউপি সদস্য মোখলেস মিনা জানান, নাম কেটে দেওয়ার নামে তার কাছ থেকেও মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়।
একটি কল রেকর্ডে ইউপি সদস্যকে বলতে শোনা যায়,
“এনসিপির লোকজন একটা তালিকা করছে। টাকা দিলে নাম কাইটা দেবে, না দিলে মামলায় নাম ঢুকায় দিবে—এইভাবে ধান্দা খোঁজে। মেরাজ এইগুলা নিয়াই বেশি করতেছে।”
ভুক্তভোগী নারীদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
এক নারী তার লিখিত অভিযোগে জানান, মেরাজুলের সঙ্গে তার দীর্ঘ তিন বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তিনি অনৈতিক সম্পর্কে জড়ান এবং একপর্যায়ে গোপনে ছবি তুলে নেন। পরে ঐ ছবি দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে দুই লাখ টাকা হাতিয়ে নেন ও আরও অর্থ দাবি করেন। অবশেষে ভুক্তভোগী নারী রাজৈর থানায় ও সেনা ক্যাম্পে অভিযোগ দায়ের করেন।
আরেক নারী জানান, তার সন্তান থ্রি-ডি ডিজিটাল স্কুলে পড়ত। মেরাজুল শিক্ষক থাকা অবস্থায় রাতে তাকে ফোন দিয়ে বিরক্ত করতেন। পরে বিষয়টি জানালে স্কুল কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেয়।
স্কুল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
থ্রি-ডি ডিজিটাল স্কুলের পরিচালক আরিফুজ্জামান টিপু বেগ বলেন,
“স্কুলের টাকা চুরি ও নারী ঘটিত কেলেঙ্কারির কারণে আমরা তাকে চাকরি থেকে বহিষ্কার করেছি। পরবর্তীতে একই অপরাধে আরও তিনটি স্কুল থেকেও তাকে বের করে দেওয়া হয়।”
তিনি আরও জানান, প্রধান শিক্ষক থাকা অবস্থায় অভিভাবকদের কাছ থেকে টাকা তুলে হিসাব না দিয়ে প্রায় ৪০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন মেরাজুল। পাশাপাশি বিদেশে থাকা অভিভাবকদের স্ত্রীদের টার্গেট করে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগ অস্বীকারে মেরাজুল
সব অভিযোগ অস্বীকার করে মাদারীপুর জেলা এনসিপির সদস্য মেরাজুল ইসলাম বলেন,
“স্কুল, নারী কেলেঙ্কারি, বালু ব্যবসা ও মামলা দিয়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। আপনারা চাইলে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন।”
তবে ফাঁস হওয়া ভিডিও কল সম্পর্কে তিনি বলেন,
“আমার ফোন হারিয়ে গেছে। ওই ফোনে কি ছিল না ছিল, আমি জানি না।”
দল ও প্রশাসনের অবস্থান
মাদারীপুর জেলা এনসিপির যুগ্ম সমন্বয়কারী আজগর শেখ বলেন,
“মেরাজুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কেন্দ্রকে জানানো হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
রাজৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহফুজুল হক জানান,
“বালু উত্তোলন নিয়ে এর আগে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। পাইকপাড়া থেকেও অভিযোগ পেয়েছি। কেউ ছাড় পাবে না।”
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অবস) জাহাঙ্গীর আলম বলেন,
“মিথ্যা হয়রানির বিষয়ে অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”