বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলীয় প্রতীকের ইতিহাস যেন এক বিচিত্র অধ্যায়। নৌকা ও লাঙল—এই দুটি প্রতীক শুধু নির্বাচনের চিহ্ন নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী।
যুক্তফ্রন্ট থেকে নৌকার যাত্রা
১৯৫৪ সালের ৪ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গঠিত হয় বিরোধী দলগুলোর ঐক্যজোট ‘যুক্তফ্রন্ট’। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী ও খাজা নাজিমুদ্দিন ছিলেন এই জোটের প্রধান নেতা।
১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল বিজয় অর্জন করে পরাজিত করে মুসলিম লীগ সরকারকে।
যুক্তফ্রন্টের সবচেয়ে বড় দল ছিল আওামী মুসলিম লীগ, আর জোটের নির্বাচনি প্রতীক ছিল ‘নৌকা’। যুক্তফ্রন্ট ভেঙে যাওয়ার পর এই প্রতীক চলে আসে আওয়ামী মুসলিম লীগের হাতে।
পরবর্তীতে ১৯৫৭ সালে দলটি ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে নতুন নাম নেয়—আওয়ামী লীগ।
নৌকার প্রথম ভোটযাত্রা ১৯৭০ সালে
যদিও আওয়ামী লীগ নৌকা প্রতীক পেয়েছিল, এই প্রতীকে ভোটে অংশ নিতে তাদের অপেক্ষা করতে হয় ১৯৭০ সালের সাধারণ পরিষদ নির্বাচন পর্যন্ত।
শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নৌকা প্রতীকে অংশ নিয়ে ১৬০টি আসনে জয়ী হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন,
“১৯৭০ সালেই প্রথমবার আওয়ামী লীগ নৌকা প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেয়। তখন আওয়ামী লীগের শরীকরাও এই প্রতীক দাবি না করায় পরবর্তীতে নৌকাই হয়ে যায় আওয়ামী লীগের স্থায়ী প্রতীক।”
তিনি আরও বলেন,
“নদী মাতৃক বাংলাদেশে নৌকা ছিল মানুষের নিত্যসঙ্গী। সেই কারণেই আওয়ামী লীগের কাছে নৌকা প্রতীকটি ছিল সহজে গ্রহণযোগ্য ও জনবান্ধব।”
স্বাধীনতার পর থেকে স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন—সব ক্ষেত্রেই আওয়ামী লীগ নৌকা প্রতীকেই ভোটে অংশ নিয়ে এসেছে।
তবে ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দলটির কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
ফলে নির্বাচন কমিশনও আওয়ামী লীগের নিবন্ধন ও দলীয় প্রতীক নৌকা স্থগিত রাখে। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের হালনাগাদ তালিকায়ও নৌকা প্রতীক স্থগিত অবস্থায় রয়েছে।
লাঙল প্রতীকের হাতবদলের ইতিহাস
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নৌকার পাশাপাশি লাঙল প্রতীকটিও বহন করছে দীর্ঘ ইতিহাস। আজ এটি জাতীয় পার্টির প্রতীক হলেও, এর শেকড় অবিভক্ত ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত।
তখন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে কৃষক প্রজা পার্টির দলীয় প্রতীক ছিল লাঙল।
পরে সেই প্রতীকের মালিকানা যায় আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বাধীন জাতীয় লীগের হাতে।
পাকিস্তান আমলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় লীগ লাঙল প্রতীকে ভোটে অংশ নেয়।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচনেও (১৯৭৩) আতাউর রহমান খান এই প্রতীকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
১৯৮৪ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে আতাউর রহমান খান প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন এবং জাতীয় লীগ বিলুপ্ত হয়।
এরপর এরশাদ নিজেই গ্রহণ করেন লাঙল প্রতীক, যা পরবর্তীতে জাতীয় পার্টির দলীয় প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন,
“আতাউর রহমান খান এক সময়ে এরশাদের সঙ্গে জোটে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর থেকেই লাঙল প্রতীক জাতীয় পার্টির দখলে আসে।”
লাঙল এখন দুই ভাগে
নব্বইয়ের পর থেকে অনুষ্ঠিত আটটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি লাঙল প্রতীকেই ভোটে অংশ নিয়েছে। যদিও একাধিকবার ভাঙনের মুখে পড়েছে দলটি, কিন্তু প্রতীকটি কখনও হাতছাড়া হয়নি এরশাদের উত্তরসূরিদের কাছ থেকে।
তবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আবারও দলটি বিভক্ত হয়েছে।
আনিসুল ইসলাম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন অংশ নতুন কমিটি গঠন করে নির্বাচন কমিশনের কাছে লাঙল প্রতীকের দাবিদার হিসেবে আবেদন করেছে।
তবে নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, লাঙল প্রতীকের মালিকানা এখনো রয়েছে জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির অংশের কাছে।
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ‘নৌকা’ ও ‘লাঙল’ শুধু প্রতীক নয়, এগুলো বয়ে এনেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও পরিবর্তনের গল্প।