ঢাকাসহ দেশের সব জেলার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল চত্বর অস্বাভাবিক ব্যস্ততায় পূর্ণ। তবে তা রোগীসেবার নয়, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের বঞ্চনার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা এক বৃহৎ মানবিক আন্দোলনের কারণে।
পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী তারা বুধবার (১০ ডিসেম্বর) সকাল থেকে মানববন্ধন, প্রতীকী অবস্থান ও সীমিত কর্মবিরতি পালন করছেন, যা সারাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এদিন সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে দেখা যায়, হাসপাতালের সামনের প্রশস্ত প্রাঙ্গণে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের দীর্ঘ মানববন্ধন। দুই হাতে ব্যানার, কণ্ঠে দৃঢ় স্লোগান ‘দশম গ্রেড বাস্তবায়ন চাই, পেশাগত মর্যাদা চাই।’
তাদের মুখে ক্ষোভের রেখা, চোখে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ব্যথা আর প্রতিশ্রুতির প্রতি অবিশ্বাস। যেন বহু বছরের অপেক্ষা তাদের কণ্ঠে একসঙ্গে বিস্ফোরিত হয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রাম, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ, খুলনা, রাজশাহীসহ দেশের সব বিভাগীয় ও জেলা হাসপাতালেই একইসঙ্গে চলছে কর্মসূচি। জেলা সদর হাসপাতাল থেকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল—সব জায়গায় সকাল ৯টা থেকে ১১টার মধ্যে টেকনোলজিস্টরা মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন।
আন্দোলনকারীদের মতে, এটি তাদের কেন্দ্রীয় আন্দোলন পরিষদের ঘোষিত চূড়ান্ত সতর্ক কর্মসূচি।
তাদের দাবি, এটি শুধু বেতন বৃদ্ধির আন্দোলন নয়, এটি পেশাগত মর্যাদা পুনরুদ্ধারের লড়াই। তাদের দাবিগুলো হলো-
১. ডিপ্লোমাধারী টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের ১০ম গ্রেড প্রদান।
২. স্নাতক ডিগ্রিধারীদের জন্য ৯ম গ্রেড সৃষ্টি।
৩. পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে স্বতন্ত্র টেকনিক্যাল ডিরেক্টরেট প্রতিষ্ঠা।
৪. দীর্ঘদিনের নিয়োগ জট, পদোন্নতি স্থবিরতা ও বেতন বৈষম্য নিরসন।
ন্যাশনাল নিউরো সায়েন্সেস হাসপাতালের সিনিয়র টেকনোলজিস্ট ও সমন্বয়ক মোহাম্মদ মেহেদী হাসান বলেন,’ এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআই থেকে ল্যাবের প্রতিটি পরীক্ষায় আমরা রোগ নির্ণয়ের মেরুদণ্ড। কিন্তু আমাদের সেই অবদান এখনো পুরোনো গ্রেডের অন্ধকারেই পড়ে আছে। দক্ষ জনবল ধরে রাখতে চাইলে আমাদের ন্যায্য মর্যাদা দেয়া ছাড়া বিকল্প নেই।’
অন্যদিকে এক সিনিয়র ফার্মাসিস্ট বলেন, ‘একজন রোগীর ওষুধ ব্যবস্থাপনা ভুল হলে জীবন সংশয়ের সৃষ্টি হয়। অথচ আমাদের পেশার গুরুত্ব বারবার প্রমাণ করতে হয়। এবার সরকারকে প্রমাণ দিতে হবে, তারা আমাদের কথা শুনতে প্রস্তুত।’
এদিন সীমিত কর্মবিরতির কারণে কিছু হাসপাতালে সকালবেলার নিয়মিত পরীক্ষা–নিরীক্ষায় বিলম্ব দেখা গেছে। তবে জরুরি সেবা ভেঙে না পড়ার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রেখেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
একটি সরকারি হাসপাতালের পরিচালক জানান, ‘দাবিগুলো যথার্থ। তবে কর্মবিরতির কারণে রোগীরা কিছুটা ভোগান্তিতে পড়ছেন। আমরা জরুরি বিভাগ স্বাভাবিক রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ‘টেকনোলজিস্ট–ফার্মাসিস্টদের গ্রেড সংশোধন নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে কাজ করছে।’
তার ভাষায়, ‘সরকার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে।’
এদিকে আন্দোলনকারীরা প্রশ্ন তুলছেন, ইতিবাচক মানে কী? কখন বাস্তবায়ন হবে? তাদের দাবি, কেবল আশ্বাস নয়, চাই স্পষ্ট সময়সীমা।
দশম গ্রেড বাস্তবায়ন পরিষদের মুখপাত্র ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র ফার্মাসিস্ট নাসির আহমেদ রতন বলেন, ’এক বছর ধরে আমরা শুধু আশ্বাস শুনছি। বুধবারের কর্মসূচি ছিল সতর্কতা। দ্রুত প্রজ্ঞাপন না এলে আমরা দেশব্যাপী পূর্ণদিবস কর্মবিরতিতে যেতে বাধ্য হব।’
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের এই আন্দোলন দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের এক গভীর কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন। তাদের দাবি মেটানো শুধু পেশাজীবীদের সন্তুষ্টি নয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থার মানোন্নয়নের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।’
এখন প্রশ্ন, সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবে, নাকি আন্দোলন আরও বিস্তৃত হবে? মূলত চাপ বাড়ছে দুই দিকেই। সমাধান এখন সময়ের দাবি।