Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

collapse
Home / তথ্যপ্রযুক্তি / এআই বনাম কর্মসংস্থান : প্রযুক্তি কি আমাদের রুটি-রুজি কেড়ে নিচ্ছে, নাকি নতুন দিগন্ত খুলছে? - Chief TV

এআই বনাম কর্মসংস্থান : প্রযুক্তি কি আমাদের রুটি-রুজি কেড়ে নিচ্ছে, নাকি নতুন দিগন্ত খুলছে? - Chief TV

2026-06-23  ডেস্ক রিপোর্ট  46 views
এআই বনাম কর্মসংস্থান : প্রযুক্তি কি আমাদের রুটি-রুজি কেড়ে নিচ্ছে, নাকি নতুন দিগন্ত খুলছে? - Chief TV
বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে যখন ব্যাংকগুলোতে কম্পিউটারাইজড সিস্টেম চালু হচ্ছিল, তখন একটা বড় শোরগোল উঠেছিল—"কম্পিউটার মানুষের চাকরি খেয়ে ফেলবে!" বহু বছর পর, ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা ঠিক একই রকম এক আশঙ্কার মুখোমুখি।
 
তবে এবার ভিলেনের নাম 'কম্পিউটার' নয়, নাম তার 'জেনারেটিভ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স' বা এআই।

​গত কয়েক বছরে চ্যাটজিপিটি, মিডজার্নি বা ক্লডের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তিগুলো যেভাবে ডালপালা মেলেছে, তাতে আমাদের তরুণদের একটা বড় অংশ—বিশেষ করে যারা ফ্রিল্যান্সিং, কনটেন্ট রাইটিং, গ্রাফিক ডিজাইন বা বেসিক কোডিংয়ের সাথে যুক্ত—তারা এক ধরণের অস্তিত্ব সংকটে ভুগছেন।
 
প্রশ্নটা এখন আর ভবিষ্যতের নয়, প্রশ্নটা আজকের: এআই কি সত্যিই আমাদের তরুণদের কর্মসংস্থান কেড়ে নিচ্ছে, নাকি এটি আসলে নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার?

​আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং গ্লোবাল টেক ফোরামগুলোর সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, প্রথাগত এবং পুনরাবৃত্তিমূলক (repetitive) কাজগুলো এআই খুব দ্রুত নিজের দখলে নিয়ে নিচ্ছে। যে ডেটা এন্ট্রি, সাধারণ কন্টেন্ট রাইটিং বা বেসিক লোগো ডিজাইনের জন্য একজন ফ্রিল্যান্সারকে আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করতে হতো, এখন এআই মাত্র কয়েক সেকেন্ডে তার চেয়ে নিখুঁত আউটপুট দিচ্ছে।

​বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, অনলাইন শ্রমের বাজারে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ যোগানদাতা। আমাদের লাখ লাখ তরুণ ঘরে বসে ফ্রিল্যান্সিং করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছেন।
 
কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের ফ্রিল্যান্সারদের একটি বড় অংশ 'লো-স্কিল' বা প্রাথমিক স্তরের কাজের ওপর নির্ভরশীল। আর এআই ঠিক এই প্রাথমিক স্তরের কাজগুলোকেই সবচেয়ে আগে গ্রাস করছে। ফলে আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসগুলোতে কাজের অর্ডার কমে যাওয়ার একটা দৃশ্যমান চাপ তৈরি হয়েছে, যা অনেক তরুণের মনেই হতাশার জন্ম দিচ্ছে।

​অর্থনীতিতে একটা কথা আছে—'ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন' বা সৃজনশীল ধ্বংস। অর্থাৎ, নতুন প্রযুক্তির আগমনে পুরনো কর্মসংস্থান ধ্বংস হয় ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বড় এবং উন্নত কর্মসংস্থানের বাজার তৈরি হয়। এআই-এর ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে।

​আজকে যে তরুণটি কেবল "বাংলা থেকে ইংরেজি অনুবাদ" করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, এআই-এর কারণে হয়তো তার কাজ কমে গেছে। কিন্তু একই সাথে 'এআই প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং', 'এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট এডিটিং', 'ডেটা অ্যানালিটিক্স' এবং 'সাইবার সিকিউরিটি'র মতো একেবারে নতুন কিছু খাতের জন্ম হয়েছে, যেখানে দক্ষ মানুষের অভাব আকাশচুম্বী।

​আসলে এআই মানুষকে প্রতিস্থাপন করছে না; বরং "এআই ব্যবহার করতে জানা একজন মানুষ, এআই না জানা একজন মানুষকে প্রতিস্থাপন করছে।" প্রযুক্তি কোনো শত্রু নয়, প্রযুক্তি হলো একটি অত্যন্ত শক্তিশালী টুল বা হাতিয়ার। আপনি যদি কাঠ কাটার জন্য কুড়ালের বদলে আধুনিক করাত ব্যবহার করতে না শেখেন, তবে দোষটা করাতির, করাতের নয়।

​আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এবং দক্ষতা উন্নয়নের মডেল এখনো অনেকটাই সনাতন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় এখনো থিওরিকে যতটা প্রাধান্য দেওয়া হয়, গ্লোবাল টেক ট্রেন্ডের সাথে তাল মেলানোকে ততটা নয়। এআই-এর এই ঝড়ে টিকে থাকতে হলে আমাদের দ্রুত স্ট্র্যাটেজি বদলাতে হবে:

​১. রি-স্কিলিং এবং আপ-স্কিলিং (Reskilling & Upskilling): তরুণদের বুঝতে হবে যে, শুধু 'কপি-পেস্ট' বা সাধারণ স্কিল দিয়ে ২০২৬ সালের বাজারে টিকে থাকা অসম্ভব। ডিজাইনারদের এখন শুধু ডিজাইন শিখলে হবে না, এআই টুল ব্যবহার করে কীভাবে ১০ গুণ দ্রুত আইডিয়া জেনারেট করা যায় (AI-assisted design) তা শিখতে হবে। প্রোগ্রামারদের শিখতে হবে এআই-এর কোড রিভিউ করার দক্ষতা।

২. হিউম্যান টাচ বা মানবিক দক্ষতার গুরুত্ব: এআই চমৎকার তথ্য দিতে পারে, কিন্তু সে আবেগ, সংস্কৃতি, এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝে না। লেখার মধ্যে যে 'হিউম্যান টাচ' বা মৌলিক ক্রিয়েটিভিটি, সেটা মানুষেরই একক সম্পত্তি। তরুণদের তাদের স্ট্র্যাটেজিক থিংকিং, প্রবলেম সলভিং এবং ক্রিয়েটিভ স্কিল বাড়াতে হবে—যা এআই কখনো নকল করতে পারবে না।

৩. পলিসি এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ: ফ্রিল্যান্সিং একাডেমি এবং সরকারি হাই-টেক পার্কগুলোর ট্রেনিং মডিউলকে আমূল বদলে ফেলতে হবে। সনাতন গ্রাফিক ডিজাইন বা এসইও (SEO) কোর্সের জায়গায় 'এআই ইন্টিগ্রেশন' এবং 'অ্যাডভান্সড টেকনোলজি'র কোর্স বাধ্যতামূলক করা সময়ের দাবি।

​ইতিহাস সাক্ষী, মানুষ কখনো প্রযুক্তির কাছে হারেনি, যদি না সে নিজে স্থবির হয়ে বসে থাকে। এআই আমাদের তরুণদের জন্য কোনো অভিশাপ নয়, বরং এটি একটি ওয়েক-আপ কল (Wake-up call) বা জেগে ওঠার ডাক। এটা আমাদের সস্তা শ্রমের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে 'মেধাশ্রমের' চূড়ায় পৌঁছানোর সুবর্ণ সুযোগ।

​ভয় পেয়ে প্রযুক্তির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখার কোনো উপায় আজ আর নেই। ডারউইনের সেই বিখ্যাত তত্ত্বটি এআই যুগের জন্য সবচেয়ে বেশি সত্য—"এখানে সে-ই টিকে থাকবে, যে সবচেয়ে শক্তিশালী বা বুদ্ধিমান নয়; বরং সে-ই, যে পরিবর্তনের সাথে সবচেয়ে দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে।" আমাদের তরুণদের সেই মানিয়ে নেওয়ার এবং এআই-কে নিজের দাস বানিয়ে নতুন কর্মসংস্থানের নেতৃত্ব দেওয়ার এখনই সময়।
 
 

​শীমুল চৌধুরী, লেখক ও নির্মাতা

 

Share: