আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন বণ্টন নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে বাদ দিয়েই জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ২৫৩ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে। গত বৃহস্পতিবার রাতে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। তখন জানানো হয়েছিল, অবশিষ্ট আসনগুলো ইসলামী আন্দোলনের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। তবে এর একদিন পরই, শুক্রবার বিকেলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এককভাবে ২৬৮ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে।
ইসলামী আন্দোলনের নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য, দলের স্বার্থ বিবেচনায় রেখেই তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী এখনও আশা করছে, শেষ পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলন জোটে ফিরে আসবে। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, দুই দলের আবার এক ছাতার নিচে আসা এখন বেশ কঠিন।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—এই বিভাজনে কার লাভ হচ্ছে, কার ক্ষতি হচ্ছে? তৃতীয় কোনো রাজনৈতিক শক্তি কি এতে সুবিধা পাচ্ছে? কেউ কেউ মনে করছেন, ভোটের অঙ্কে এর প্রভাব খুব বেশি হবে না। আবার অনেকে বলছেন, বিভাজনের ফলে ইসলামী রাজনীতির সম্মিলিত শক্তি দুর্বল হয়ে পড়বে।
এক বাক্স নীতি থেকে বিভাজন
জানা যায়, ইসলামী দলগুলোকে ‘এক বাক্স নীতি’র আওতায় আনতে প্রথম উদ্যোগ নেয় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, নেজামে ইসলাম পার্টি ও অন্যান্য ইসলামপন্থি দলকে নিয়ে একাধিক দফা বৈঠক হয়। পরে এতে যোগ দেয় জামায়াতে ইসলামী এবং পরবর্তীতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
তবে জামায়াত জোটে যোগ দেওয়ার পর আসন সমঝোতা ও নতুন দল অন্তর্ভুক্তি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত এক বাক্স নীতিতে ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এর আগেই ইসলামপন্থি কয়েকটি দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে থেকে যায়। আবার কিছু দল রয়েছে জাতীয় পার্টির সঙ্গে, আর কিছু দল এককভাবেও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী দলগুলো একত্রে থাকলে তাদের ভোটব্যাংক ও আসনসংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু বর্তমান বিভাজন বিএনপিকে সুবিধা দেবে এবং নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক করে তুলতেও সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে জামায়াতবিরোধী বিভিন্ন সংগঠন ও দল এই সুযোগে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে পারে।
বিশ্লেষকদের ভিন্ন মত
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরীর মতে, এই বিভাজনের ফলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে বিএনপি, আর ক্ষতির মুখে পড়ছে জামায়াতে ইসলামী। তাঁর ভাষায়, ইসলামী দলগুলো একত্রে থাকলে একটি শক্ত ভোটব্যাংক তৈরি হতো, যা এখন ভেঙে যাবে।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ মনে করেন, এই বিচ্ছেদ জাতীয় রাজনীতিতে বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না। তাঁর মতে, ইসলামী আন্দোলন বরাবরই একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক অবস্থান থেকে রাজনীতি করে এসেছে এবং এককভাবে নির্বাচন করাও তাদের সমর্থকদের কাছে গ্রহণযোগ্য। ভোটের হিসাবে এর প্রভাব এক শতাংশেরও কম হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক সংস্কারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ভবিষ্যতেও জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন একসঙ্গে কাজ করতে পারে। আদর্শিক ও আকিদাগত পার্থক্য ইসলামী রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়।
দলগুলোর অবস্থান
ইসলামী আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, দল নিজেদের কল্যাণ বিবেচনা করেই জোট থেকে বেরিয়ে এসেছে। তাঁর ভাষায়, “এতে আমাদের ক্ষতি হলে আমরা এই সিদ্ধান্ত নিতাম না।” তিনি অভিযোগ করেন, আসন সমঝোতায় নীতি ও ইনসাফের প্রশ্নে তারা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেন, ইসলামী আন্দোলন সরে যাওয়ায় বড় কোনো প্রভাব পড়বে না। বরং এতে এনসিপির আসন বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে তিনিও এখনও আশা করছেন, আলোচনার মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলন আবার ঐক্যে ফিরতে পারে।
এদিকে জামায়াতে ইসলামী জানিয়েছে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা ইসলামী আন্দোলনের সিদ্ধান্ত মূল্যায়ন করবে। জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ইসলামী আন্দোলনের জন্য আসন খোলা রাখা হয়েছে এবং আলোচনা এখনও শেষ হয়নি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ইসলামী আন্দোলনের জোট ছেড়ে যাওয়ার পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র নেই; এটি বরং সমন্বয়ের ব্যর্থতা। তাঁর মতে, বাকি আসনগুলো সমঝোতার ভিত্তিতেই বণ্টন করা হবে।
সব মিলিয়ে, ইসলামী রাজনীতির এই বিভাজন নির্বাচনী মাঠে কী প্রভাব ফেলবে—তা নিয়ে মতভেদ থাকলেও, রাজনৈতিক অঙ্গনে এটি এখন আলোচনার কেন্দ্রে।