আগামীকাল সোমবার ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন। তবে এ সফর কেবল আনুষ্ঠানিক প্যারেড বা ভোজসভাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। দুই পক্ষের মূল লক্ষ্য দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে আলোচনায় থাকা ভারত–ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) চূড়ান্ত করা।
বিশেষজ্ঞ ও সরকারি কর্মকর্তারা একে বিশ্বের অন্যতম বড় বাণিজ্য চুক্তি হিসেবে দেখছেন, যাকে কেউ কেউ ‘মাদার অব অল ডিলস’ বলেও অভিহিত করছেন।
ট্রাম্পের নীতি ও বৈশ্বিক রাজনীতির প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার পেছনে বড় কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি। ট্রাম্প ভারতের পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছিলেন, একই সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গেও নানা বাণিজ্যিক বিরোধ তৈরি হয়। এতে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন উভয়ই উপলব্ধি করছে—যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা চ্যাথাম হাউসের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে ভারত দেখাতে চায় যে তারা কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং বহুমুখী ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাসী।
চুক্তিতে দুই পক্ষের লাভ-লোকসান
ভারত বর্তমানে বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর একটি এবং চলতি বছর জিডিপিতে জাপানকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। ইউরোপ চায় ভারতের বিশাল ও ক্রমবর্ধমান বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে। চুক্তি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের একটি বিশাল মুক্তবাজার তৈরি হবে।
অন্যদিকে ইউরোপ ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। গত বছর ভারত ইউরোপে প্রায় ৭৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। তবে ২০২৩ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিছু বিশেষ সুবিধা প্রত্যাহার করায় ভারতের ওষুধ, পোশাক ও ইস্পাত খাত চাপের মুখে পড়ে।
নতুন চুক্তি হলে এসব বাধা অনেকটাই দূর হবে এবং ভারতীয় পণ্য কম দামে ইউরোপের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে।
বিতর্কিত বিষয়গুলো
এত বড় চুক্তির পথে এখনও কিছু জটিলতা রয়ে গেছে। ইউরোপ সম্প্রতি ‘কার্বন ট্যাক্স’ বা সিবিএএম চালু করেছে, যা ভারতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভারত আবার কৃষক স্বার্থ রক্ষায় কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যকে চুক্তির বাইরে রাখতে চায়। তবে গাড়ি, ওয়াইন ও স্পিরিটের ওপর শুল্ক ধাপে ধাপে কমানোর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতের কাছে শক্তিশালী পেটেন্ট আইন ও তথ্য সুরক্ষার নিশ্চয়তা চাইছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২৭ জানুয়ারির শীর্ষ বৈঠকে এই চুক্তির বিষয়ে বড় কোনো ঘোষণা আসতে পারে। সফল হলে ভারত ও ইউরোপ উভয়ই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাণিজ্যিক নির্ভরতা কমাতে পারবে।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন
জিটিআরআইয়ের অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, সিবিএএম কার্যত ভারতের রপ্তানি পণ্যের ওপর নতুন ধরনের শুল্কের মতো কাজ করবে, যা বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাদের অতিরিক্ত নিয়ম মানা, জটিল প্রতিবেদন জমা দেওয়া এবং কার্বন নির্গমন সংক্রান্ত ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এই চুক্তি সত্যিকারের প্রবৃদ্ধিসহায়ক অংশীদারত্ব হবে নাকি একপক্ষীয় সুবিধার চুক্তিতে রূপ নেবে—তা নির্ভর করছে শেষ মুহূর্তে এসব ইস্যু কীভাবে সমাধান হয়, তার ওপর।
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অ্যালেক্স ক্যাপ্রি মনে করেন, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য অনিশ্চিত অংশীদারের ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়ক হবে। এতে শুল্ক আরোপ, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কিংবা সরবরাহব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকিও হ্রাস পাবে।
তিনি জানান, মানবাধিকার ও পরিবেশগত বিষয় নিয়ে ইউরোপে কিছু আপত্তি থাকলেও বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতকে পাশে পাওয়াকেই ইউরোপীয় নেতারা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন।
বিশ্লেষকদের সামগ্রিক মূল্যায়ন—স্বল্পমেয়াদে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে এই চুক্তি ভারত ও ইউরোপ উভয়ের জন্যই লাভজনক হতে পারে।