ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার ঘটনাকে ঘিরে মার্কিন জনমত প্রায় সমানভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। রয়টার্স–ইপসোসের এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, এ অভিযানের পক্ষে ও বিপক্ষে মতামতের পার্থক্য অত্যন্ত সামান্য।
জরিপ অনুযায়ী, ৩৩ শতাংশ মার্কিনি মাদুরোকে ধরে আনার সিদ্ধান্ত সমর্থন করেছেন। বিপরীতে ৩৪ শতাংশ এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন। আর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা ৩২ শতাংশ অংশগ্রহণকারী এ বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট অবস্থান নেননি।
রাজনৈতিক দলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির সমর্থকদের মধ্যেই অভিযানের প্রতি সমর্থন তুলনামূলকভাবে বেশি। যারা সামরিক অভিযানের পক্ষে মত দিয়েছেন, তাদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ রিপাবলিকান, ১১ শতাংশ ডেমোক্র্যাট এবং ২৩ শতাংশ রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ।
মাদুরো আটক হওয়ার পর ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়েও জরিপে মতামত নেওয়া হয়। এতে দেখা যায়, অধিকাংশ মার্কিনি চান না যে নতুন সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলা পরিচালনার দায়িত্ব নিক। এ বিষয়ে ৪৩ শতাংশ সরাসরি বিরোধিতা করেছেন, ৩৪ শতাংশ সমর্থন দিয়েছেন এবং ২০ শতাংশ অনিশ্চিত রয়েছেন।
এছাড়া ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সেনা মোতায়েনের প্রশ্নেও নেতিবাচক মনোভাব স্পষ্ট। জরিপে ৪৭ শতাংশ মার্কিনি সেনা পাঠানোর বিপক্ষে মত দিয়েছেন, আর ৩০ শতাংশ এর পক্ষে। একইভাবে দেশটির তেলক্ষেত্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরিকল্পনার বিরুদ্ধেও জনমত বেশি। এ বিষয়ে ৪৬ শতাংশ বিরোধিতা করেছেন এবং ৩০ শতাংশ সমর্থন জানিয়েছেন।
জরিপে অংশ নেওয়া ৭২ শতাংশ মার্কিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় অতিরিক্ত হস্তক্ষেপে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা তাদের মতে উদ্বেগজনক।
মাদুরো আটক হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে “চালাবে”; যদিও তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা এই সম্ভাবনাকে বাস্তবসম্মত নয় বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। ট্রাম্প আরও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব যদি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সহযোগিতা না করে, তবে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রে আনার পর প্রথমবারের মতো নিউইয়র্কের একটি আদালতে হাজির করা হয় নিকোলাস মাদুরোকে। তার বিরুদ্ধে মাদক সন্ত্রাস, মাদক পাচার এবং অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে। একই অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস, ছেলে নিকোলাস এরনেস্তো মাদুরো গুয়েরা এবং আরও তিনজনকে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের আজীবন কারাদণ্ড হতে পারে।
মাদুরো অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি অপহরণের শিকার এবং এখনও ভেনেজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট।
জাতিসংঘের প্রতিক্রিয়া
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের কড়া সমালোচনা করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর জানিয়েছে, এই অভিযান আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এক বিবৃতিতে বলা হয়, কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করতে পারে না।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ভেনেজুয়েলার মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও একতরফা সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং এই ধরনের পদক্ষেপ দেশটিতে অস্থিরতা ও অতিরিক্ত সামরিকীকরণ বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
চীনের অবস্থান
চীনও এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রে মাদুরোর বিচার ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের গুরুতর লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতার প্রতি অবজ্ঞার শামিল। চীনের উদ্যোগে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অনুষ্ঠিত জরুরি বৈঠকেও মার্কিন অভিযানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
উল্লেখ্য, লাতিন আমেরিকায় ভেনেজুয়েলা চীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। দেশটি চীনের কাছ থেকে শত বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ নিয়েছে এবং মাদুরো আটক হওয়ার আগেও চীনা প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন।