Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

Home Ad
collapse
হোম / জাতীয় / চুলায় আগুন না জ্বললে, ভোটটা যাবে কোন ভরসায় - Chief TV

চুলায় আগুন না জ্বললে, ভোটটা যাবে কোন ভরসায় - Chief TV

2026-01-12  ডেস্ক রিপোর্ট  127 views
চুলায় আগুন না জ্বললে, ভোটটা যাবে কোন ভরসায় - Chief TV

শীতের সকালে শরীর গরম রাখতে যখন এক কাপ চা আর সামান্য ভাতই ভরসা, ঠিক তখনই চুলায় আগুন না জ্বলা মানে শুধু রান্নার সমস্যা নয়—এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ওপর সরাসরি আঘাত। ক্ষুধা, ঠান্ডা আর অনিশ্চয়তা একসঙ্গে চেপে বসলে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে পড়ে। আজ ঢাকার অসংখ্য মানুষের সকাল ঠিক সেভাবেই শুরু হচ্ছে—হতাশা আর অসহায়ত্ব নিয়ে।

এক সময় যে কাজে কোনো চিন্তা করতে হতো না—ঘুম থেকে উঠে চুলার সুইচ ঘোরানো—সেটাই এখন অনিশ্চিত। অনেক বাসায় বারবার চেষ্টা করেও আগুন জ্বলে না। কোথাও নিভু নিভু শিখা দেখা যায়, যা দিয়ে ভাত বসানো তো দূরের কথা, পানি গরম করাও কঠিন। ফলে রাজধানীতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার ঘটনাটি আর নিছক কারিগরি ত্রুটি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি এখন একটি সামাজিক সংকটে রূপ নিচ্ছে।

নগরজীবনের ছন্দ ভেঙে পড়েছে

যে শহরে কোটি মানুষের বসবাস, যেখানে রান্নাবান্না ছাড়া স্বাভাবিক জীবন কল্পনাই করা যায় না, সেখানে গ্যাস না থাকা মানে পুরো নগরজীবন অচল হয়ে পড়া। এই সংকট সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে। যারা বছরের পর বছর পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহার করে এসেছে, তারা ধরে নিয়েছিল অন্তত রান্নার ঝামেলা নেই। আর যাদের সেই সুযোগ ছিল না, তারা ধীরে ধীরে এলপি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।

কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে—পাইপলাইনে গ্যাস নেই, আবার এলপি গ্যাসও সহজলভ্য নয়। কোথাও পাওয়া গেলেও দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এক সংকট যেন আরেক সংকট ডেকে আনছে।

ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, শ্যামলী, নিউমার্কেট, গাবতলীসহ রাজধানীর বহু এলাকায় দিনের পর দিন গ্যাসের চাপ এত কম যে চুলা জ্বলে না বললেই চলে। কোথাও দিনে একবার, তাও অদ্ভুত সময়ে—দুপুরের শেষ ভাগে কিংবা গভীর রাতে—সামান্য গ্যাস আসে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী কিংবা গৃহিণীর পক্ষে এই সময় রান্না করা প্রায় অসম্ভব।

এর ফল হিসেবে অনেক পরিবার বাধ্য হচ্ছে বাইরে থেকে খাবার কিনতে, যা সংসারের খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। কেউ কেউ বিদ্যুৎচালিত চুলার দিকে ঝুঁকছেন, কিন্তু সেটিও সবার সামর্থ্যের মধ্যে পড়ে না।

এলপি গ্যাস: নতুন দুঃস্বপ্ন

যাদের ঘরে পাইপলাইনের গ্যাস নেই, তাদের জন্য এলপি গ্যাসই একমাত্র ভরসা। কিন্তু সংকটকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে বাজারে সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে লাগামহীনভাবে। সরকারি নির্ধারিত দামে যেখানে ১২ কেজির সিলিন্ডার থাকার কথা প্রায় ১,৩০০ টাকা, সেখানে বাস্তবে বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকায়। অনেক দোকানে আবার সিলিন্ডারই নেই।

ব্যবসায়ীরা সরবরাহ সংকট, আমদানি জটিলতা আর ডলার সংকটের কথা বলছেন। এসব যুক্তির পেছনে বাস্তবতা থাকলেও শেষ পর্যন্ত এর পুরো বোঝা এসে পড়ছে ভোক্তার কাঁধে।

একজন গৃহিণীর দিনের কথা ভাবলেই পরিস্থিতির গভীরতা বোঝা যায়। সকালে সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে হবে, অফিসগামী স্বামীর খাবার তৈরি করতে হবে। অথচ রান্না করার মতো গ্যাস নেই। বাইরে থেকে খাবার আনলে খরচ বাড়ে, আবার প্রতিদিন রেস্টুরেন্টের খাবার স্বাস্থ্যসম্মতও নয়। তিনি জানেন না, দিনটি কীভাবে সামলাবেন। এই গল্প এখন রাজধানীর হাজারো পরিবারের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

সংকটের কারণ ও ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন

এই পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে সামনে এসেছে তিতাস গ্যাসের প্রধান পাইপলাইনে ক্ষতির বিষয়টি। আমিনবাজার এলাকায় তুরাগ নদীর নিচ দিয়ে যাওয়া একটি পাইপলাইনে জাহাজের নোঙরের আঘাতে ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে পাইপলাইনে পানি ঢুকে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। একই সময়ে মিরপুর রোড এলাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস ভাল্ভ ফেটে যাওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে কয়েকটি লাইন বন্ধ রাখতে হয়েছে।

তিতাস কর্তৃপক্ষ বলছে, দ্রুত মেরামতের কাজ চলছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই ধরনের কাজ একদিনে শেষ হয় না। আর ‘সময় লাগবে’ মানে সাধারণ মানুষের জীবনে আরও কয়েক দিনের ভোগান্তি।

এখানেই বড় প্রশ্নটি উঠে আসে—এটি কি কেবল দুর্ঘটনা, নাকি দীর্ঘদিনের অবহেলা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার ফল? রাজধানীর গ্যাস পাইপলাইনের বড় অংশই পুরোনো। অনেক জায়গায় রক্ষণাবেক্ষণের অভাব স্পষ্ট। নদীর নিচ দিয়ে যাওয়া পাইপলাইনগুলোর নিরাপত্তা, নিয়মিত পরীক্ষা ও ঝুঁকি মূল্যায়ন আদৌ যথাযথভাবে হচ্ছে কি না—এই প্রশ্নগুলো আর উপেক্ষা করা যায় না।

নীতি আর বাস্তবতার ফাঁক

সরকার বহুদিন ধরেই বলছে, দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ কমে আসছে এবং এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। কিন্তু এলএনজি ব্যয়বহুল এবং আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ডলার সংকট ও বৈশ্বিক অস্থিরতা মিলিয়ে গ্যাস ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

একদিকে বলা হচ্ছে নতুন আবাসিক গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে না, সবাইকে এলপি গ্যাসে যেতে হবে। অন্যদিকে এলপি গ্যাসের বাজারে নেই কার্যকর নজরদারি, নেই মূল্য নিয়ন্ত্রণের বাস্তব প্রয়োগ। ফলে সামান্য সংকটেই তৈরি হয় কৃত্রিম ঘাটতি আর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি।

এই পুরো ব্যবস্থার ভেতরে সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় পড়ে সাধারণ মানুষ—যারা সিদ্ধান্ত নেয় না, নীতি বানায় না, অথচ প্রতিটি ব্যর্থতার ফল ভোগ করে।

ভোটের আগে আস্থার প্রশ্ন

মানুষের চাওয়াটা খুব সাধারণ—চুলায় আগুন থাকুক, সকালে ভাত বসানো যাক, রাতে পরিবার একসঙ্গে খেতে বসতে পারুক। একটি শহরের ন্যূনতম সভ্যতার মানদণ্ড এটুকুই। কিন্তু এই ন্যূনতম প্রয়োজন পূরণ করতেও যদি প্রতিদিন লড়াই করতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

নির্বাচনের আর মাত্র এক মাস বাকি। গণতান্ত্রিক প্রত্যাবর্তনের এই সময়ে যদি বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির মতো মৌলিক সেবাগুলোই অনিশ্চিত থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় গিয়ে আস্থা রাখবে? যখন দৈনন্দিন জীবন টিকে থাকার সংগ্রামে পরিণত হয়, তখন নির্বাচন, গণতন্ত্র কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি মানুষের কাছে ফাঁপা শব্দ হয়ে ওঠে।

এই সংকট হয়তো সাময়িকভাবে কেটে যাবে। কিন্তু যদি এখান থেকে শিক্ষা না নেওয়া হয়, অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, জবাবদিহি ও মানুষের ভোগান্তিকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে না আনা হয়, তাহলে ঢাকার সকাল বারবার শুরু হবে নিভে যাওয়া চুলা আর দীর্ঘশ্বাস দিয়ে।

আর তখন প্রশ্নটি আরও জোরালো হবে—চুলায় যদি আগুনই না জ্বলে, মানুষ ভোট দেবে কোন ভরসায়?


Share:

ট্যাগস: chief tv chief tv news জাতীয়