নির্বাচনের আগে ভোটার এলাকা পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক ও নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। ভোটার তালিকা হালনাগাদের পাশাপাশি বছরের যে কোনো সময় একজন ভোটার তার বর্তমান ঠিকানা অনুযায়ী অন্য এলাকায় ভোটার হিসেবে স্থানান্তরের আবেদন করতে পারেন। তবে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০২৫ সালে ভোটার এলাকা পরিবর্তনের হার আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সংশ্লিষ্ট শাখা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত ভোটার এলাকা পরিবর্তনের জন্য আবেদন জমা পড়েছে ৭ লাখ ১ হাজার ৩৩৭টি। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৫৬৫ জন ভোটারের আবেদন। তুলনামূলকভাবে ২০২৪ সালে ভোটার এলাকা পরিবর্তন করেছিলেন ৩ লাখ ৭০ হাজার ৯১৭ জন, যা ২০২৫ সালের সংখ্যার প্রায় অর্ধেক।
এ বিষয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এএসএম হুমায়ুন কবীর জানান, নাগরিকদের জমা দেওয়া আবেদন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে নিয়ম অনুযায়ী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এখানে কোনো ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণত এক বছরে এত বেশি ভোটার স্থানান্তরের আবেদন আসে না। চলতি বছরে আবেদন বেড়ে যাওয়ার পেছনে একটি বড় কারণ হতে পারে তিন দফায় ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম পরিচালনা করা।
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান এবং সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, ভোটার স্থানান্তর দ্বিগুণের বেশি হওয়াকে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই। তার মতে, মানুষ ভোট দেওয়ার বিষয়ে আশাবাদী হচ্ছে বলেই তারা এমন এলাকায় ভোটার হওয়ার চেষ্টা করছে, যেখানে তাদের ভোটের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি পড়তে পারে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনাও এখানে একটি কারণ হতে পারে—অনেকে সচেতনভাবেই নিজের ভোটকে কার্যকর করতে আগ্রহী।
ইসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১০টি প্রশাসনিক অঞ্চলের মধ্যে ঢাকা অঞ্চলে ভোটার স্থানান্তর হয়েছে ৮৬ হাজার ৮২৫ জন। অন্যান্য অঞ্চলে এই সংখ্যা হলো—ফরিদপুরে ৩৯ হাজার ৯৫ জন, খুলনায় ৮১ হাজার ৭২৫ জন, ময়মনসিংহে ৭৮ হাজার ৮০৫ জন, রংপুরে ৬৩ হাজার ৮৯৭ জন, রাজশাহীতে ৭২ হাজার ৮১৫ জন, বরিশালে ৮৫ হাজার ৭২০ জন এবং চট্টগ্রামে ৩০ হাজার ৮৫ জন। সবচেয়ে কম ভোটার স্থানান্তর হয়েছে সিলেট অঞ্চলে, যেখানে এ সংখ্যা ২৭ হাজার ৫৭৬ জন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কিছু আবেদন এখনও যাচাই প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সেগুলো অনুমোদিত হলে মোট স্থানান্তরিত ভোটারের সংখ্যা আরও কিছুটা বাড়তে পারে।
গত চার বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট ভোটার এলাকা পরিবর্তন করেছেন ২১ লাখ ১৫ হাজার ৪৫৮ জন। এর মধ্যে ২০২১ সালে ছিলেন ৫ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৪ জন, ২০২২ সালে ৭ লাখ ১৭ হাজার ২০৮ জন, ২০২৩ সালে ৪ লাখ ৬১ হাজার ৫৫৯ জন এবং ২০২৪ সালে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৯১৭ জন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন গত ১০ নভেম্বর পর্যন্ত ভোটার এলাকা পরিবর্তনের আবেদন গ্রহণ করে। এসব আবেদন নিষ্পত্তির শেষ সময় ছিল ১৭ নভেম্বর। তবে নির্ধারিত সময়ের পরও কমিশনের অনুমোদন পেলে বিশেষ ক্ষেত্রে ভোটার স্থানান্তরের সুযোগ রাখা হয়েছে।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২৩৪ জন।