Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

collapse
Home / খুলনা বিভাগ / সারাদেশ / বাগেরহাট / প্রজনন মৌসুমেও মৎস্য নিধন, জীববৈচিত্র্য বিপন্ন - Chief TV

প্রজনন মৌসুমেও মৎস্য নিধন, জীববৈচিত্র্য বিপন্ন - Chief TV

2026-07-01  ম. ম. রবি ডাকুয়া, বাগেরহাট প্রতিনিধিঃ  32 views
প্রজনন মৌসুমেও মৎস্য নিধন, জীববৈচিত্র্য বিপন্ন - Chief TV
‎সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সুন্দরবনে অবাধে চলছে বিষ প্রয়োগ ও নিষিদ্ধ জালে মৎস্য নিধন, যার নেপথ্যে রয়েছে বন বিভাগের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ।

‎বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের মৎস্য ভাণ্ডার ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার লক্ষ্যে প্রতি বছরের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস মাছ ও কাঁকড়া শিকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সরকার। এই সময়ের মধ্যে বনের অভ্যন্তরে জেলেদের প্রবেশ এবং পাস-পারমিট প্রদান সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে।
 
অথচ সরকারি এই বিধিনিষেধ কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। স্থানীয় প্রভাবশালী জেলে ও ব্যবসায়ীদের একটি অসাধু চক্র বন বিভাগের কতিপয় দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে মোটা অঙ্কের উৎকোচ দিয়ে নিয়মিত বনের গহীনে প্রবেশ করছে।
 
অমাবস্যা ও পূর্ণিমার তিথিকে কেন্দ্র করে বিশেষ কৌশলে পরিচালিত এই অবৈধ শিকারি চক্রের কারণে বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। মূলত প্রশাসনিক নজরদারির অভাব এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নৈতিক অবক্ষয়ের সুযোগ নিয়ে এই মৎস্য নিধনযজ্ঞ চলছে, যা সুন্দরবনের দীর্ঘমেয়াদী বাস্তুসংস্থানের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে।

‎ভুক্তভোগী স্থানীয় জেলেদের ভাষ্যমতে, সুন্দরবনে এখন মাছ শিকারের অধিকার নির্ভর করছে উৎকোচের পরিমাণের ওপর। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জেলে জানিয়েছেন, জাল ও মাছ ধরার পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে তাদের ‘টাকা লেনদেনের’ চুক্তি হয়।
 
যারা নির্দিষ্ট হারে উৎকোচ পরিশোধ করতে পারে, তাদের জন্য সুন্দরবনের দুয়ার উন্মুক্ত থাকে এবং যারা এই অনৈতিক লেনদেনে অস্বীকৃতি জানায়, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে আদালতে চালান দেওয়ার ভয় দেখানো হয়।
 
কেবল মাছ শিকারই নয়, বনের অভ্যন্তরে নিষিদ্ধ বিষ প্রয়োগের কারণে মাছের পোনা ও অন্যান্য জলজ প্রাণী বিলুপ্তির পথে। এছাড়া কাঁকড়া ধরার জন্য নদীর চরে আটন বসানোর সময় নির্বিচারে কাটা হচ্ছে সুন্দরী গাছের চারা, যা বনের প্রাকৃতিক সুরক্ষা বেষ্টনীকে ধ্বংস করছে।
 
এই অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডের ফলে সুন্দরবনের মৎস্য ভাণ্ডার দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে এবং স্থানীয় মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকাও দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চয়তার কবলে পড়ছে।

‎এ বিষয়ে ফিশ ফার্ম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ফোয়াব) ও খুলনা কেন্দ্রীয় মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির সভাপতি মোল্লা সামছুর রহমান সাহীন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, প্রজনন মৌসুমে এই ধ্বংসলীলা বন্ধ না হলে অচিরেই সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
 
তিনি বন বিভাগকে কেবল লোক দেখানো অভিযানের বাইরে এসে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে অবৈধ শিকারিদের বিকল্প কর্মসংস্থানের আওতায় আনা এবং বন বিভাগের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
 
অন্যদিকে, পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী স্বীকার করেছেন যে, কিছু জেলে লুকিয়ে বনে প্রবেশ করছে। তবে তিনি দাবি করেছেন, নিয়মিত অভিযানের মাধ্যমে অনেক নৌকা আটক করা হয়েছে এবং বন বিভাগের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
 
কর্তৃপক্ষের এই দায়সারা বক্তব্য এবং মাঠ পর্যায়ের বাস্তব অবস্থার মধ্যে ব্যাপক ফারাক দৃশ্যমান, যা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

‎সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা কেবল একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিবেশ রক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রজনন মৌসুমে এ ধরনের মৎস্য নিধন চলতে থাকলে ভবিষ্যতে সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদ অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে, যার প্রভাব পড়বে স্থানীয় অর্থনীতি ও উপকূলীয় জনজীবনে।
 
বন বিভাগের অসাধু চক্রের যোগসাজশ এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের ব্যর্থতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। দীর্ঘমেয়াদী এই সংকট নিরসনে কেবল অভিযান নয়, বরং বন বিভাগের প্রশাসনিক সংস্কার এবং মাঠ পর্যায়ের নজরদারি ব্যবস্থা আরও আধুনিক ও স্বচ্ছ করা অপরিহার্য।
 
সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হলে দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপনা এবং কঠোর আইনি প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই, অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে এই ম্যানগ্রোভ বন কেবল মানচিত্রের নামেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

Share: