কলকাতার পার্ক সার্কাস অঞ্চলের পরিচিত রাস্তা 'সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ'-এর নাম বদলে 'গোপাল মুখার্জী রোড' করার কলকাতা পৌর সংস্থার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই নাম বদলের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেওয়ায় এই বিতর্ক আরো উসকে উঠেছে। এই ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে অনেক হিন্দুত্ববাদী অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, ‘কলকাতার কসাইয়ের নামে রাস্তার নাম রাখা যাবে না।’
হিন্দুত্ববাদীরা মূলত ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার সময়কার অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ও পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে 'কলকাতার কসাই' হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকেন। তবে ঐতিহাসিক সত্য হলো, এই রাস্তাটি আসলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে ছিলই না।
কলকাতা শহরের স্বীকৃত ইতিহাসবিদ পি থাঙ্কাপ্পন নায়ারের তথ্যসূত্র অনুযায়ী, এই রাস্তাটি মূলত ছিল প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ হাসান সোহরাওয়ার্দীর নামে, যার বাড়িটি এই রাস্তাতেই অবস্থিত এবং বর্তমানে সেখানে বাংলাদেশ উপদূতাবাসের গ্রন্থাগার ও তথ্য কেন্দ্র রয়েছে।
কলকাতা শহরের স্বীকৃত ইতিহাসবিদ পি থাঙ্কাপ্পন নায়ারের তথ্যসূত্র অনুযায়ী, এই রাস্তাটি মূলত ছিল প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ হাসান সোহরাওয়ার্দীর নামে, যার বাড়িটি এই রাস্তাতেই অবস্থিত এবং বর্তমানে সেখানে বাংলাদেশ উপদূতাবাসের গ্রন্থাগার ও তথ্য কেন্দ্র রয়েছে।
সম্পর্কে হাসান সোহরাওয়ার্দী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মামা-ভাগ্নে হলেও, সামাজিক মাধ্যমের একাংশ এবং কয়েকটি সংবাদমাধ্যমও এই দুই নাম গুলিয়ে ফেলে ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও তার ফেসবুক পোস্টে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দিকেই ইঙ্গিত করে একে 'ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন' বলে দাবি করেন।
অপরদিকে, যার নামে রাস্তার নতুন নামকরণ করা হয়েছে, সেই গোপাল মুখার্জী ওরফে 'গোপাল পাঁঠা' ১৯৪৬ সালের 'দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস'-এর সময় হিন্দুদের রক্ষাকর্তা হিসেবে হিন্দুত্ববাদীদের কাছে পরিচিত হলেও, অন্য পক্ষের কাছে তিনি ‘মুসলিম-বিদ্বেষী’ হিসেবে চিত্রিত।
যদিও এক সাক্ষাৎকারে গোপাল মুখার্জী দাবি করেছিলেন, দাঙ্গার সময় হিন্দুদের রক্ষা করতে অস্ত্র ধরলেও তিনি বহু মুসলমানের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন এবং তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত না থেকে তৎকালীন কংগ্রেস নেতা বিধান চন্দ্র রায়ের ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১ বছর আগে পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রীর 'দ্য বেঙ্গল ফাইলস' ছবি মুক্তির সময় তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ও পরিচালক নিজেই কলকাতায় ‘গোপাল পাঁঠা’র নামে রাস্তা করার দাবি তুলেছিলেন।
অথচ সোহরাওয়ার্দী পরিবারের ইতিহাস নিয়ে বই লেখা গবেষক আলিমুজ্জামানের মতে, শিক্ষাবিদ হাসান সোহরাওয়ার্দীর সাথে ক্যালকাটা কিলিংয়ের দূরতম কোনো সম্পর্ক ছিল না।
১৯৩০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়া হাসান সোহরাওয়ার্দী ছিলেন লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অফ সার্জনস-এর ফেলো, যিনি চ্যান্সেলর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে রক্ষায় বীরত্ব দেখিয়ে ব্রিটিশদের কাছ থেকে 'নাইট' উপাধি পেলেও পরবর্তীতে তা ত্যাগ করেন।
অন্যদিকে, বিবিসির একমাত্র সাক্ষাৎকারে গোপাল মুখার্জী স্বীকার করেছিলেন যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সৈন্যদের কাছ থেকে কেনা অস্ত্র দিয়ে দাঙ্গার সময় তার দলবল বহু মানুষকে হত্যা করেছিল, যদিও নারী ও সাধারণ মানুষকে আঘাত না করার কড়া নির্দেশ ছিল।
একজন প্রখ্যাত ও নির্দোষ শিক্ষাবিদের নামের রাস্তা ভুল পরিচয়ে বদলে ফেলার এই ঘটনাটি বর্তমানে কলকাতার রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।