দেশের কুটির শিল্প, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাত হলো অর্থনীতির অন্যতম প্রাণভোমরা। কর্মসংস্থান সৃষ্টি থেকে শুরু করে শিল্পায়ন, রপ্তানি এবং স্থানীয় বাজারের জোগান- সবখানেই এ খাতের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ খাত বর্তমানে সবচেয়ে বড় যে সংকটে পড়েছে, তা হলো ঋণখেলাপি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে- গত জুন শেষে এসএমই খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। খেলাপির হার বেড়ে হয়েছে সাড়ে ২৮ শতাংশের বেশি। খেলাপির হারে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ও শরিয়াহ ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপির হার উঠেছে প্রায় সাড়ে ৪৩ শতাংশ। আর শরিয়াহ ব্যাংকের খেলাপির হার প্রায় ৪১ শতাংশ।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন- দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সিএমএসএমএই খাতের ভূমিকাই বেশি। তবে মূল্যস্ফীতির চাপ ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে উদ্যোক্তারা বেশ চাপে রয়েছেন। বিশেষ করে ব্যবসা সংকোচন, কোভিড-পরবর্তী ধাক্কা, বাজারে অস্থিরতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যাংকের দুর্বল মনিটরিং- সব মিলিয়ে এসএমই উদ্যোক্তাদের অনেকে নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। ফলে এ খাতেও খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়ছে।
ঋণ বিতরণে গতি কম : চলতি বছরের মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের ২৫ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর বিপরীতে গত জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সিএমএসএমই খাতে রয়েছে ২ লাখ ৯৮ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৬ দশমিক শূন্য ৯০ শতাংশ। এটি আগের দুই বছরের তুলনায় কম। ২০২৪ সালে মোট ঋণের ১৮ দশমিক ৪০ শতাংশ ছিল সিএমএসএমই খাতে। আর ২০২৩ সালে ছিল ১৯ দশমিক ১১ শতাংশ। এ খাতের উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, ব্যাংকগুলো ছোটদের ঋণ দিতে অনীহা দেখায়। তারা ছোটদের ঋণ দিতে এখনও ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে। তবে ব্যাংকারদের ভাষ্য- ছোট ঋণ ব্যবস্থাপনায় খরচ তুলনামূলক বেশি। সেই সঙ্গে ছোটদের ব্যবসায়িক তথ্য, ডকুমেন্টস ও জামানতের ঘাটতি থাকে।
বাড়ছে খেলাপি ঋণ : গত জুন পর্যন্ত সিএমএসএমইতে বিতরণ করা ঋণের মধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে প্রায় ৮৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা বা ২৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ। এর মধ্যে মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণে ১০ কোটি ১ টাকা থেকে ৫০ কোটি পর্যন্ত; খেলাপির হার ৩৮ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত। আর কুটির শিল্প, অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের (সিএমএস) ঋণে এই হার ১৬ থেকে ২৬ শতাংশ। একই সময়ে বড় উদ্যোক্তাদের ঋণে (৫০ কোটি টাকার ওপরের ঋণ) খেলাপির হার উঠেছে প্রায় ৪৮ শতাংশ।
রাষ্ট্রায়ত্ত ও শরিয়াহ ব্যাংকে খেলাপির হার অস্বাভাবিক : রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে এসএমই ঋণে খেলাপির হার সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। গত জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ব্যাংকগুলোর সিএমএসএমইতে বিতরণ করা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫৫ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে প্রায় ২৪ হাজার ২৩২ কোটি টাকা বা ৪৩ দশমিক ৫০ শতাংশ। এ সময়ে বেসরকারি ব্যাংকের (শরিয়াহ ব্যাংক ব্যতিত) সিএমএসএমইতে বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল ১ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। খেলাপি হয়েছে ২৭ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা বা ১৮ দশমিক ০২ শতাংশ। একই সময়ে শরিয়াহ ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ৭৩ হাজার ৯১২ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে ৩০ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা বা ৪১ দশমিক ২৬ শতাংশ। এ সময়ে বিশেষায়িত ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণে খেলাপির হার ২৩ দশমিক ২৩ শতাংশ। তবে সিএমএসএমই ঋণে এখনও তুলনামূলক কম খেলাপি হয়েছে বিদেশি ব্যাংকের। এসব ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের মধ্যে খেলাপির হার মাত্র ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ।