ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের অবরোধের কারণে জরুরি ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশ করতে না পারায় ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ভয়াবহ এক শ্বাসতন্ত্রজনিত ভাইরাস। এতে শিশু, বয়স্ক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভোগা মানুষের মধ্যে মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন গাজার শীর্ষ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) তুরস্কভিত্তিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গাজা সিটির আল-শিফা মেডিকেল কমপ্লেক্সের চিকিৎসা পরিচালক ডা. মোহাম্মদ আবু সালমিয়া বলেন, এই ভাইরাসের আঘাতে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে। তার ভাষায়, টিকাদানের ঘাটতি, তীব্র অপুষ্টি এবং যুদ্ধজনিত দীর্ঘস্থায়ী মানসিক আঘাত পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
তিনি জানান, ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে ইতোমধ্যে অনেক মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভোগা রোগীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। আবু সালমিয়া বলেন, গাজা এক নজিরবিহীন স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের মুখোমুখি, যেখানে পরিস্থিতির অবনতি এমন গতিতে ঘটছে যা আগে কখনও দেখা যায়নি।
চিকিৎসকদের ধারণা, ভাইরাসটি ফ্লু বা করোনাভাইরাসের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে এবং এটি সব বয়সী মানুষের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ছে। আক্রান্তদের মধ্যে অনেকের উপসর্গ টানা দুই সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বর, শরীর ও হাড়ে তীব্র ব্যথা, মাথাব্যথা, বমি এবং শ্বাসকষ্ট। অনেক ক্ষেত্রে এই সংক্রমণ পরবর্তীতে মারাত্মক নিউমোনিয়ায় রূপ নিচ্ছে।
আবু সালমিয়া আরও বলেন, ইসরায়েলি হামলা শুরুর পর থেকে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা বর্তমানে সবচেয়ে ভয়াবহ সংকটের মধ্যে রয়েছে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা কার্যকর হওয়ার একশ দিনের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, বরং অবস্থা আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে ন্যূনতম চিকিৎসা সরঞ্জাম পর্যন্ত নেই।
তার ভাষায়, জীবাণুমুক্ত গজ, অস্ত্রোপচারের গাউন, অ্যান্টিবায়োটিকের মতো মৌলিক চিকিৎসা উপকরণের মারাত্মক সংকট চলছে। ক্যানসারের ওষুধ সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে গেছে। কিডনি ডায়ালাইসিস রোগী ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভোগা মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধও প্রায় নেই বললেই চলে।
তিনি মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের কথাও তুলে ধরেন। বলেন, মানসিক রোগীদের চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতির কারণে শুধু রোগীরাই নয়, পুরো সমাজই ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
আল-শিফা হাসপাতালের এই পরিচালক জানান, গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ চিকিৎসা পরীক্ষাগার এখন অচল। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উপকরণ না থাকায় চিকিৎসকেরা সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করতে পারছেন না।
ডা. আবু সালমিয়ার অভিযোগ, ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে গাজায় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের সুপারিশ করা জীবনরক্ষাকারী উপকরণও ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। অথচ কোমল পানীয়, স্ন্যাকস বা মোবাইল ফোনের মতো অপ্রয়োজনীয় পণ্য প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিকে তিনি ইচ্ছাকৃত মানবিক ক্ষতির প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেন এবং অবিলম্বে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তার আহ্বান, জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম, পরীক্ষাগারের উপকরণ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ যেন অবাধে গাজায় প্রবেশ করতে পারে।
এদিকে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইসরায়েল ধারাবাহিকভাবে হাসপাতাল, চিকিৎসাকেন্দ্র, ওষুধের গুদাম এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করেছে। পাশাপাশি চিকিৎসা সহায়তার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১ লাখ ৭১ হাজার মানুষ।
উল্লেখ্য, গত ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও তা একাধিকবার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪৬৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং প্রায় ১ হাজার ২৮৭ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।