খাবারের টেবিলে বসতেই শিশুর একটাই আবদার—মোবাইল চাই। কার্টুন, গান কিংবা রিল চালু থাকলেই মুখে খাবার ওঠে, আর স্ক্রিন বন্ধ হলেই শুরু হয় কান্না, চিৎকার আর বায়না। এখন এই দৃশ্য আর ব্যতিক্রম নয়; বরং শহর থেকে গ্রাম—অসংখ্য পরিবারেই এটি নিত্যদিনের বাস্তবতা। প্রশ্ন হলো, শিশুরা কেন খাওয়ার সময় মোবাইল ছাড়া থাকতে পারছে না? আর এই অভ্যাস কি সত্যিই নিরাপদ?
চিকিৎসক, মনোবিদ ও মনো-সমাজকর্মীদের মতে, মোবাইল দেখিয়ে শিশু খাওয়ানোর প্রবণতা ধীরে ধীরে উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি সময় বাঁচানোর সহজ উপায় মনে হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
খাওয়া শেখা, নাকি শুধু গিলে ফেলা?
বিশেষজ্ঞদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—স্ক্রিনের সামনে বসিয়ে খাওয়ালে কি শিশু আসলেই খেতে শেখে? নাকি শুধু মুখ খুলে খাবার গিলতে অভ্যস্ত হয়?
মনো-সমাজকর্মীদের মতে, মোবাইলের পর্দায় মনোযোগ আটকে থাকলে শিশু খাবারের স্বাদ, গন্ধ কিংবা রং—কোনোটিই অনুভব করে না। খাবারের সঙ্গে তার কোনো সংযোগ তৈরি হয় না। বাস্তবে অভিভাবকেরাই তখন খাওয়ানোর পুরো কাজটি করে দেন, শিশু নিজে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলে না।
সমস্যার শুরু কোথায়?
শিশু খেতে না চাইলে তার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে—খিদে না থাকা, শরীর খারাপ লাগা, খাবারের স্বাদ বা গন্ধ অপছন্দ হওয়া কিংবা জোর করে খাওয়ানোর বিরুদ্ধে স্বাভাবিক প্রতিবাদ। অনেক সময় দেখা যায়, শিশু খাবার মুখে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখে বা চিবোয় না—এটাই তার না-বলার ভাষা।
কিন্তু অনেক মা-বাবা নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবার না খেলে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। মনে হয়, কম খেলেই পুষ্টির ঘাটতি হবে। এই ভয় থেকেই মোবাইল দেখিয়ে যতটা সম্ভব বেশি খাওয়ানোর প্রবণতা তৈরি হয়।
সময় বাঁচাতে গিয়ে বড় ক্ষতি?
সন্তানের সঙ্গে গল্প করতে করতে, ধীরে ধীরে খাওয়াতে সময় লাগে—ব্যস্ত জীবনে যা অনেকের কাছেই কঠিন। সেখানে মোবাইলে প্রিয় কার্টুন চালিয়ে দিলে অল্প সময়েই কাজ শেষ করা যায়। কিন্তু এই ‘সহজ সমাধান’-এর মূল্য দিতে হয় শিশুর শরীর ও মনে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার হার প্রায় ২.৪ শতাংশ। বিশ্বব্যাপী এই বয়সী স্থূল শিশুর সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে পৌঁছেছে—যা উদ্বেগজনক।
স্ক্রিনে চোখ, পেটের সংকেত অচেনা
মনোবিদদের মতে, মোবাইল দেখতে দেখতে খাওয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—শিশু বুঝতেই পারে না সে কী খাচ্ছে বা কতটা খাচ্ছে। পেট ভরে যাওয়ার স্বাভাবিক সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছায় না। ফলে অভিভাবকেরা ‘খাচ্ছে’ ভেবে আরও খাওয়াতে থাকেন। এই অভ্যাস থেকেই ধীরে ধীরে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা ও স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ে।
তাহলে করণীয় কী?
অনেকে বলেন, খাওয়ার সময় স্ক্রিন টাইম একেবারেই বন্ধ করতে হবে। বাস্তবে এটি সহজ নয়—এ কথাও বিশেষজ্ঞরা মানেন। তবে তাদের মতে, একটু কম খাওয়ার চেয়ে মোবাইল আসক্তির ক্ষতি অনেক বেশি। বিষয়টি বুঝতে পারলেই সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
খাওয়ানোর সময় মোবাইল বা টিভি দেওয়া কোনো সমাধান নয়। শিশু কম খেলেও তা মেনে নিতে হবে।
অন্যায় বায়নাকে প্রশ্রয় দিলে ভবিষ্যতে আচরণগত সমস্যা বাড়ে। খিদে পেলে শিশু নিজেই খাবে—অপেক্ষা করাও অভিভাবকের দায়িত্ব।
খাবারে বৈচিত্র্য ও আকর্ষণ জরুরি। রংচঙে পরিবেশন শিশুর আগ্রহ বাড়ায়। সবজি দিয়ে মজার আকার তৈরি করা যেতে পারে।
রান্নার সময় শিশুকে পাশে রাখুন। কীভাবে খাবার তৈরি হচ্ছে তা দেখলে কৌতূহল বাড়ে।
বইয়ের ছবি বা আসল সবজি দেখিয়ে খাবারের পরিচয় দিন, সহজ ভাষায় উপকারিতা বোঝান।
একা না বসিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে খাওয়ান। অন্যদের খাবার উপভোগ করতে দেখলে শিশুর আগ্রহও বাড়ে।
খাওয়াকে যদি শিশুর কাছে আনন্দের অভিজ্ঞতায় রূপ দেওয়া যায়, তাহলে মোবাইলের প্রয়োজন পড়ে না। একটু সময়, একটু ধৈর্য আর সচেতন অভ্যাসই পারে শিশুদের এই নীরব স্ক্রিন-আসক্তি থেকে দূরে রাখতে।