গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করা বা সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রস্তাব নতুন করে সামনে এনেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পক্ষ থেকে এ ধরনের বক্তব্যকে ‘হুমকি’ আখ্যা দিয়ে বন্ধ করার আহ্বান জানানো হলেও ট্রাম্প তার অবস্থান থেকে সরে আসেননি। তাঁর যুক্তি, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জন্য জরুরি, আর ডেনমার্ক একা এই বিশাল ও কৌশলগত অঞ্চল সামাল দিতে সক্ষম নয়। এ বিষয়ে বিবিসি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
আর্কটিক অঞ্চলে গ্রিনল্যান্ডের ভৌগোলিক গুরুত্ব এবং বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের কারণেই দ্বীপটির প্রতি ট্রাম্পের আগ্রহ বেড়েছে। সম্প্রতি উত্তেজনা আরও তীব্র হয়, যখন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী স্টিফেন মিলারের স্ত্রী কেটি মিলার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের মানচিত্রকে মার্কিন পতাকার রঙে রাঙিয়ে ‘শিগগির’ লিখে পোস্ট দেন। এরই মধ্যে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড–সংক্রান্ত বিষয়ে একজন ‘বিশেষ দূত’ নিয়োগ দিয়েছেন, যা ডেনমার্কের রাজনৈতিক অঙ্গনে অসন্তোষ তৈরি করেছে।
কেন গ্রিনল্যান্ড নিয়ে এতটা আগ্রহ
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের আগ্রহের পেছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করছে।
প্রথমত, ভূ-কৌশলগত অবস্থান—উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মাঝখানে অবস্থিত গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, প্রাকৃতিক সম্পদ—জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলতে থাকায় গ্রিনল্যান্ডে থাকা বিপুল তেল, গ্যাস ও দুর্লভ খনিজ সম্পদ আহরণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তৃতীয়ত, চীন ও রাশিয়ার প্রভাব মোকাবিলা—ট্রাম্পের দাবি, গ্রিনল্যান্ডের আশপাশের জলসীমায় রুশ ও চীনা জাহাজের উপস্থিতি বাড়ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতা
তবে গ্রিনল্যান্ড দখল বা ক্রয়ের পথে বড় ধরনের বাধাও রয়েছে।
এক. স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন—২০০৯ সালের চুক্তি অনুযায়ী গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অংশ হলেও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তারা স্বশাসিত। ভবিষ্যতে স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্ব পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার একমাত্র গ্রিনল্যান্ডের জনগণের।
দুই. আন্তর্জাতিক আইন—কোনো ভূখণ্ডের মালিকানা বদলাতে হলে স্থানীয় জনগণের সম্মতি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রয়োজন। জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা ন্যাটোর ভেতরেই সংকট তৈরি করতে পারে, কারণ ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয়ই জোটটির সদস্য।
তিন. অর্থনৈতিক চাপ—গ্রিনল্যান্ড পরিচালনায় ডেনমার্ক প্রতিবছর বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেয়। এই ব্যয়ভার বহন করা এবং স্থানীয় জনগণের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কতটা সম্ভব, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জেনিফার কাভানাঘের মতে, আগে ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে অনেকেই গুরুত্ব না দিলেও সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহের পর পরিস্থিতি বদলেছে। তাঁর আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র যে কোনো সময় গ্রিনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে পারে।
সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়—ট্রাম্প কি সফল হবেন? ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্র ১৮৬৭ সালে রাশিয়া থেকে আলাস্কা কিনেছিল, তবে বর্তমান বিশ্বরাজনীতির বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। অধিকাংশ বিশ্লেষকের ধারণা, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের চেয়ে ডেনমার্কের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক টানাপড়েনের সম্ভাবনাই এখন বেশি।