বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে নতুনভাবে তুলে ধরছেন এমন শেফদের মধ্যে অন্যতম শেফ জাহেদ। বাংলাদেশি এই আন্তর্জাতিক কুলিনারি পেশাজীবী,যার কর্মজীবন শুরু হয় ২০১৬ সালে দুবাই থেকে। তিনি কাজ শুরু করেন লে মেরিডিয়ান আল আকাহ বিচ রিসোর্ট-এ এবং পরবর্তীতে শেরাটন শারজাহ বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা-সহ একাধিক পাঁচতারা হোটেলে দায়িত্ব পালন করেন।
সৌদি আরবে তিনি কর্মরত ছিলেন ম্যারিয়ট রিয়াদ ডিপ্লোম্যাটিক কোয়ার্টার, দ্য সেন্ট রেজিস রেড সি রিসোর্ট এবং নুজুমা, আ রিটজ-কার্লটন রিজার্ভ-এ। বর্তমানে তিনি আয়ারল্যান্ডে পড়াশোনা করছেন শ্যানন কলেজ অব হোটেল ম্যানেজমেন্ট থেকে হোটেল ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। এর সাথে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে তিনি আয়ারল্যান্ডের এনিস গলফ ক্লাব অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট-এ হেড শেফ হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
দেশীয় রন্ধন শিল্পকে বৈশ্বিক মানচিত্রে নতুনভাবে উপস্থাপনের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন শেফ জাহেদ। তিনি নিজেকে প্রচারের আলোয় নয়, বরং কাজের গভীরতা, গবেষণার শক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি অবদানের মাধ্যমে পরিচিত করতে চান।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন অনেক ক্ষেত্রেই মুখ্য হয়ে উঠেছে। তবে শেফ জাহেদ বিশ্বাস করেন,সাময়িক জনপ্রিয়তার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই তিনি নিয়মিতভাবে নিজের দক্ষতা উন্নয়ন, খাদ্যসংস্কৃতি গবেষণা এবং আধুনিক রন্ধনপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
শেফ জাহেদের অন্যতম লক্ষ্য হলো রন্ধনশিল্প শিক্ষাকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা। উচ্চমূল্যের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার পরিবর্তে তিনি সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ তৈরির চেষ্টা করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন,জ্ঞান কখনো অল্প মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। দক্ষ তরুণ শেফ তৈরি হলে দেশের রন্ধনশিল্পের ভবিষ্যৎ আরও শক্তিশালী হবে।
২০২৫ সালে কেবলমাত্র অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক 'chef jahed' অফিসিয়াল পেজ থেকে আয় ৮২ লক্ষ টাকার বেশি হয়েছে। এই আয় তার ব্যক্তিগত বেতন বা অন্য কোনো আয়ের উৎসের অন্তর্ভুক্ত নয়। এই অর্জন তার কাছে শুধু আর্থিক সাফল্য নয়, বরং তার কাজের মান ও উদ্দেশ্যের প্রতি মানুষের আস্থার প্রতিফলন।
শেফ জাহেদের প্রধান লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের গ্যাস্ট্রোনমি নিয়ে গবেষণাধর্মী কাজের মাধ্যমে একটি টেকসই পরিবর্তন আনা। তিনি দেশের খাদ্য সংস্কৃতির ইতিহাস, আঞ্চলিক রান্নার বৈশিষ্ট্য এবং আধুনিক রন্ধনপ্রযুক্তির সমন্বয়ে একটি গবেষণাভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির পরিকল্পনা করছেন।
২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের আটটি বিভাগের আঞ্চলিক কুইজিন নিয়ে গবেষণাধর্মী প্রকাশনা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্রকাশনা শুধু একটি বই হবে না, বরং বাংলাদেশের খাদ্য সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে তিনি আশা করেন। এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত থাকবে—প্রতিটি অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবারের ইতিহাস,ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত প্রভাব, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন, রান্নার প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও স্থানীয় উপাদানের ব্যবহার পদ্ধতি। বাংলাদেশের কুলিনারি ব্র্যান্ডিংয়ের স্বপ্ন
ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের কুইজিন ব্র্যান্ডিং নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি চান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের খাবারের পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়ুক। এজন্য গবেষণাভিত্তিক কন্টেন্ট, শিক্ষামূলক কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরির বিষয়েও চিন্তা করছেন।
বাংলাদেশের রন্ধনশিল্পকে বিশ্বমঞ্চে সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়েই এগিয়ে চলছেন এই কুলিনারি গবেষক। ভবিষ্যতের পথচলায় দোয়া,ভালোবাসা এবং সমর্থনই তার সবচেয়ে বড় শক্তি- এমনটাই মনে করেন শেফ।