বাংলাদেশের সর্বউত্তরের সীমান্তবর্তী উপজেলা তেঁতুলিয়া-তে সাম্প্রতিক বছরগুলো-তে চা ও পাথর শিল্পের উল্লেখযোগ্য প্রসার ঘটেছে। সবুজ চা বাগান এবং নদীকেন্দ্রিক পাথর উত্তোলন কার্যক্রম এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি এনে দিয়েছে। তবে এই উন্নয়নের বিপরীতে শ্রমিকদের জীবনযাত্রায় রয়েগেছে অনিশ্চয়তা, বঞ্চনা ও নিরাপত্তাহীনতার বাস্তব চিত্র।
তেঁতুলিয়ায় চা শিল্পের বিস্তার গত এক দশকে দ্রুত বেড়েছে।
বহিরাগত বিনিয়োগকারীদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি চা বাগান। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হলেও শ্রমিকদের অভিযোগ, তারা ন্যায্য মজুরি ও মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অধিকাংশ শ্রমিক দৈনিক মজুরিভিত্তিক কাজ করেন এবং নির্ধারিত মজুরি অনেক ক্ষেত্রে মানা হয় না। অনেক সময় মজুরি পরিশোধেও অনিয়ম দেখা যায়।
চা বাগানে কর্মরত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হয়নি। দীর্ঘ সময় রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে কাজ করলেও সেই অনুযায়ী পারিশ্রমিক পান না তারা। ফলে পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হয়।
অন্যদিকে তেঁতুলিয়ার বিভিন্ন নদী ও চরাঞ্চলে পাথর উত্তোলন কার্যক্রমেও বিপুল সংখ্যক শ্রমিক যুক্ত রয়েছেন। এই খাতে কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও জীবিকার তাগিদে শ্রমিকরা প্রতিদিন নদীর তলদেশ থেকে পাথর সংগ্রহ করছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা কোনো ধরনের সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই কাজ করেন। নদীর স্রোত, গভীরতা এবং মাটিধসের ঝুঁকি প্রতিনিয়ত তাদের জীবনকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
স্থানীয় একজন পাথর শ্রমিক শুক্র জানান , বর্ষা মৌসুমে পাথর উত্তোলনের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। তবুও বিকল্প আয়ের উৎস না থাকায় শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করতে পারেন না। দুর্ঘটনা ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ ক্ষতিপূরণ বা সহায়তা পাওয়া যায় না।
চা ও পাথর—এই দুই খাতই তেঁতুলিয়ার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর তদারকির অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শ্রম আইন বাস্তবায়নে দুর্বলতা, ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত না হওয়া এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শ্রমিকদের পরিস্থিতি উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে তদারকি জোরদার করা হবে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহল মনে করছেন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং শ্রম আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা না হলে এই শিল্পের টেকসই উন্নয়ন ব্যাহত হতে পারে।
তেঁতুলিয়ার চা ও পাথর শিল্প দেশের অর্থনীতিতে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তব ও টেকসই রূপ দিতে হলে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও অধিকার নিশ্চিত করা দাবি।