ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে প্রতিদিনই ভিড় করছেন শত শত মানুষ। পণ্যবাহী ট্রাক, যাত্রীবাহী যান আর পথচারীদের চোখ নদীর বুকে—আজ ফেরি চলবে কি না, সেই অপেক্ষা। কিন্তু সেই অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে প্রতিদিন। গত ১৯ নভেম্বর ২০২৫ থেকে টানা ৫৫ দিন ধরে নাব্যতা সংকটে বন্ধ রয়েছে চিলমারী-রৌমারী ফেরি চলাচল।
২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে চালু হয়েছিল এই ফেরি সার্ভিস। কিন্তু মাত্র আড়াই বছরের মাথায় সেটিই এখন দুর্ভোগ ও অনিশ্চয়তার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ফেরি বন্ধ থাকায় কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার মানুষ এবং ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে।
ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনকে যমুনা সেতু হয়ে দীর্ঘ পথ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে কয়েকগুণ। কৃষিপণ্য পরিবহন, হাটবাজারে পণ্য সরবরাহ এবং জরুরি যাতায়াত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিআইডব্লিউটিএ চিলমারী ঘাট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ৮৩৮ দিনের মধ্যে ৪৩০ দিনই ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি সময় এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ কার্যত অচল। এর ফলে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং বিআইডব্লিউটিসি মাসে গড়ে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টাকা লোকসানের মুখে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রহ্মপুত্র নদে অতিরিক্ত পলি জমে ডুবো চর সৃষ্টি হওয়া এবং নদীপথ পরিবর্তনের কারণেই দ্রুত নাব্যতা সংকট দেখা দিচ্ছে। নিয়মিত ড্রেজিং করা হলেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ ভিন্ন। তাদের দাবি, খনন কার্যক্রম কার্যকর নয়; বরং ড্রেজিংয়ের নামে অর্থ অপচয় হচ্ছে, কিন্তু ফেরিপথে নাব্যতা ফিরছে না।
সোনাহাট স্থলবন্দর থেকে ময়মনসিংহে পাথর পরিবহনকারী ট্রাকচালক জসিম উদ্দিন বলেন,
‘ফেরি বন্ধ থাকলে যমুনা সেতু হয়ে ঘুরে যেতে হয়। এতে সময় ও খরচ দুটোই বেড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য।’
বিআইডব্লিউটিএ ড্রেজিং বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান জানান,
‘চিলমারী-রৌমারী ফেরিপথ প্রায় ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা দেশের সবচেয়ে বড় ফেরিপথগুলোর একটি। অতিরিক্ত সিলটেশনের কারণে এখানে সারা বছরই ড্রেজিং প্রয়োজন। স্থানীয়দের বাধার কারণে কয়েক মাস কাজ বন্ধ ছিল। বর্তমানে দুটি সরকারি ড্রেজার দিয়ে সীমিত পরিসরে খনন চলছে।’
অন্যদিকে বিআইডব্লিউটিসির চিলমারী ঘাটের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) প্রফুল্ল চৌহান বলেন,
‘ডুবো চর ও খনন বন্ধ থাকায় ফেরি চলাচল পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বর্ষা মৌসুম ছাড়া ফেরি চালুর সম্ভাবনা আপাতত নেই।’
একসময় যে ফেরিঘাট উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগে নতুন দিগন্তের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, আজ তা নাব্যতা সংকট ও অব্যবস্থাপনার কারণে অনিশ্চয়তার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের বুকে থমকে থাকা ফেরির সঙ্গে যেন থমকে আছে পুরো অঞ্চলের যোগাযোগ ও সম্ভাবনা।