এক সময় বাঙালি কনের বিয়ের সাজ মানেই ছিল লাল বেনারসি বা শিফনের শাড়ি, কপালে কুমকুম আর ভারী গয়না। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিরচেনা সাজেও এসেছে নানা রূপান্তর। কখনো জমকালো কারুকাজের শাড়ি ও জড়োয়া অলংকার, আবার কখনো দেশীয় ঐতিহ্যের মসলিন কিংবা জামদানিতে ধরা দিচ্ছে আধুনিক কনের সৌন্দর্য। সময়ের সঙ্গে বিয়ের আয়োজন যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে বর-কনের সাজপোশাকের ধরণও। চলতি বছরে বিয়ের সাজ ও অলংকারের ট্রেন্ডে দেখা যাচ্ছে ঐতিহ্য আর আধুনিকতার এক সুন্দর মেলবন্ধন।
বদলে যাওয়া বিয়ের পোশাকের ধারা
বর্তমান সময়ে বিয়ের পোশাকের ক্ষেত্রে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। বিশ্বরঙের স্বত্বাধিকারী ও ফ্যাশন ডিজাইনার বিপ্লব সাহার মতে, দেশীয় ফ্যাশনের সঙ্গে যুক্ত ডিজাইনাররা বিয়ের পোশাকেও নিজেদের ঐতিহ্য তুলে ধরতে সচেষ্ট। যদিও এখনও অনেকে বিয়েতে বিদেশি পোশাক বা আচার অনুসরণ করেন, তবে দেশীয় কাপড় ও নকশার মধ্যেই যে আভিজাত্য ও জাঁকজমক সম্ভব—সে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনাই তাঁদের লক্ষ্য।
কাতান, বেনারসি, মসলিন ও জামদানির মতো দেশি কাপড় দিয়েই তৈরি হচ্ছে আধুনিক ব্রাইডাল পোশাক। এমনকি লেহেঙ্গার মতো জনপ্রিয় পোশাকও এখন দেশীয় কাপড়ে নতুনভাবে নকশা করা হচ্ছে। মোটিফ ও ডিজাইনের ক্ষেত্রেও স্থান পাচ্ছে বাংলার নিজস্ব সাংস্কৃতিক উপাদান। দীর্ঘদিন কনের সাজে লাল বেনারসির আধিপত্য থাকলেও এখন কনেরা শুধু লালেই সীমাবদ্ধ নেই। গোলাপি, পিচ, পার্পল, আকাশি কিংবা বিভিন্ন প্যাস্টেল রঙের শাড়িও দেখা যাচ্ছে বিয়ে ও বৌভাতের সাজে।
বরের পোশাকেও এসেছে পরিবর্তন। গায়েহলুদ, পানচিনি, বিয়ে কিংবা বৌভাত—প্রতিটি অনুষ্ঠানেই এখন কনের পোশাকের সঙ্গে মিল রেখে বরের পোশাক ডিজাইন করা হচ্ছে। এতে সামগ্রিক সাজে একটি সুন্দর সমন্বয় তৈরি হয় এবং ছবিতেও তা বেশ দৃষ্টিনন্দন লাগে। শুধু বর-কনে নয়, বিয়ের আয়োজনে পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনের পোশাকের ক্ষেত্রেও দেশীয় পোশাক ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ নিজেদের সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদেরই।
বিয়ের সাজে মেকআপ ও গয়নার নতুন ধারা
এ বছরের বিয়ের সাজে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে মেকআপে। ভারী মেকআপের বদলে এখন ঝোঁক ন্যাচারাল ও ফটোজেনিক লুকের দিকে। সাজ থাকবে রঙিন, কিন্তু পরিষ্কার ও পরিমিত। ক্লাসিক গ্ল্যামারের সঙ্গে আধুনিক ফিনিশ—এই সমন্বয়ই এখন ট্রেন্ড। ‘মডেল-মেকআপ লুক’ সবচেয়ে আলোচিত ধারা, যেখানে মেকআপ থাকবে নিখুঁত, কিন্তু মুখ যেন অতিরিক্ত মেকআপে ঢাকা মনে না হয়।
শোভন মেকওভারের কসমেটোলজিস্ট শোভন সাহা জানান, এখন বিয়েতে একাধিক অনুষ্ঠান থাকায় ভিন্ন ভিন্ন সাজ গ্রহণ করছেন কনে। ভারতীয় বিভিন্ন অঞ্চলের সাজের পাশাপাশি বিদেশি স্টাইলও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। শীতকালীন বিয়েতে লাল, মেজেন্টা, সোনালি, গাঢ় নীল বা গাঢ় রঙের পোশাকের সঙ্গে গয়না ম্যাচিং বা কনট্রাস্ট করে পরার পরামর্শ দেন তিনি।
মেকআপের ক্ষেত্রে পোশাক ও কনের ব্যক্তিগত লুক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত ফুল কভারেজ হলেও হালকা ফাউন্ডেশন, সফট কনট্যুর ও হাইলাইট, চোখে ব্রাউন বা কপার টোনের আই মেকআপ এবং ঠোঁটে রেড, ওয়াইন বা ডিপ রোজ শেড এখন বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। কনের পাশাপাশি অনেক বরও এখন মডেল-মেকআপ লুক নিচ্ছেন, যা ক্যামেরায় বেশ ফটোজেনিক হয় এবং মুখকে স্বাভাবিক ও সতেজ দেখায়।
শেষ কথা
২০২৬ সালের বিয়ের সাজ আর একরকম নয়। প্রতিটি অনুষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদা সাজ—এই ধারাই এখন জনপ্রিয়। পোশাক, অলংকার ও মেকআপের সঙ্গে যদি থাকে আরাম আর নিজের মতো করে সাজার স্বাচ্ছন্দ্য, তাহলেই জীবনের বিশেষ দিনটিতে সেই সৌন্দর্য হয়ে ওঠে সবচেয়ে আলাদা ও স্মরণীয়।