বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও সরকারের অবস্থান এখন একেবারেই স্পষ্ট—জাতীয় মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস নয়। ভারতে নিরাপদ পরিবেশ না থাকায় সেখানে অনুষ্ঠিতব্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ অনড় রয়েছে।
গতকাল যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল এই অবস্থান প্রকাশ্যে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলও জানান, ভারতের ভেন্যুতে খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে বোর্ড অটল। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আজ বা আগামীকাল আইসিসিকে পুনরায় চিঠি পাঠানো হবে।
এর আগে মঙ্গলবার রাতে ক্রিকেটভিত্তিক ওয়েবসাইট ইএসপিএনক্রিকইনফো জানায়, আইসিসি বাংলাদেশকে ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলতেই হবে—এমন বার্তা দিয়েছে। তবে বিসিবি এ দাবি সরাসরি নাকচ করেছে। বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘আলটিমেটাম’ দেওয়ার যে খবর ছড়ানো হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। আইসিসির কাছ থেকে প্রাপ্ত বার্তার সঙ্গে এসব প্রতিবেদনের কোনো মিল নেই।
গতকাল যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টার সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিসিবি সভাপতি ছাড়াও সহসভাপতি ফারুক আহমেদ ও মো. শাখাওয়াত হোসেন, ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমূল আবেদীনসহ একাধিক পরিচালক উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, “ভারতে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নেই। আমরা আরেক আয়োজক দেশ শ্রীলংকায় খেলতে চাই। দেশের সম্মান ও মর্যাদার বিনিময়ে বিশ্বকাপ খেলার প্রশ্নই ওঠে না।”
তিনি আরও বলেন, আইসিসির পাঠানো চিঠিতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা উদ্বেগ যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। তার মতে, বিষয়টি শুধু নিরাপত্তার নয়—এটি জাতীয় অপমানের প্রশ্নও। তবে বাংলাদেশ মূলত নিরাপত্তা ইস্যুকেই সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আইপিএল থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে বিসিসিআইয়ের হস্তক্ষেপে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে বর্তমান পরিস্থিতির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন ক্রীড়া উপদেষ্টা। তিনি বলেন, “এটাই প্রমাণ করে ভারতে খেলাধুলার উপযোগী পরিবেশ নেই। আমরা কারও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে চাই না, কিন্তু আমাদের খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ও দেশের মর্যাদা প্রশ্নে কোনো ছাড় নেই।”
বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বলেন, শুধু খেলোয়াড় নয়—সাংবাদিক, স্পনসর ও সমর্থকদের নিরাপত্তাও বিবেচনার বিষয়। সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বোর্ডের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ কারণেই সরকারিভাবে নির্দেশনার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি জানান, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বাংলাদেশ তার অধিকার আদায়ের লড়াই চালিয়ে যাবে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিরাপত্তাজনিত কারণে ম্যাচ বা ভেন্যু পরিবর্তনের বহু নজির রয়েছে উল্লেখ করে বিসিবি সভাপতি বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের যুক্তি শক্ত। তাই ভারতে খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে আমরা অটল থাকছি।”
এদিকে আইপিএল থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় ভারতের বিজেপি সরকারের কড়া সমালোচনা করেছেন জম্মু–কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—একজন খেলোয়াড় কেন বলির পাঁঠা হবেন? তার মতে, এ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে ওমর আবদুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ভারতের কোনো ক্ষতি করেনি, বরং দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক চাপের কারণেই মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে—যেখানে খেলোয়াড় নিজে কিংবা তার দল কেউই তাকে ফিরিয়ে নিতে চায়নি।
তিনি আরও বলেন, খেলাধুলাকে রাজনীতির বাইরে রাখা উচিত। কিন্তু যারা খেলাকে ধর্ম ও রাজনীতির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলে, তারাই এ ধরনের সংকট তৈরি করছে।
উল্লেখ্য, আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। ভারত ও শ্রীলংকা যৌথভাবে টুর্নামেন্টটির আয়োজন করছে। তবে ‘সি’ গ্রুপে থাকা বাংলাদেশের গ্রুপপর্বের সব ম্যাচই নির্ধারিত হয়েছে ভারতের কলকাতা ও মুম্বাইয়ে। সূচি অনুযায়ী, উদ্বোধনী দিনেই কলকাতায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মাঠে নামার কথা বাংলাদেশের।