আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনীতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে এক নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে দীর্ঘদিন পর ভোটের মাঠে কার্যকর প্রতিযোগিতা ফিরতে পারে—এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। জনপ্রিয়তা জরিপ, অতীত নির্বাচনের ফল এবং সাংগঠনিক শক্তির বিচারে বিএনপি এখনো এগিয়ে থাকলেও, ৫ আগস্ট–পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় পুনর্গঠিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের নেতৃত্বাধীন জোট বিএনপির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
৫১টি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনে বাস্তব লড়াইটি মূলত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিছু কিছু আসনে জাতীয় পার্টি (জাপা) ভোটের সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, দলীয় নেতা ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে এমন ইঙ্গিতই পাওয়া গেছে। প্রচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু না হলেও মাঠপর্যায়ে দুই জোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইতোমধ্যে দৃশ্যমান।
অংশগ্রহণকারী দলগুলোর শক্তি ও সীমাবদ্ধতা
এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়া অর্ধশতাধিক দলের মধ্যে ১৩টি দল ৫ আগস্ট–পরবর্তী সময়ে নিবন্ধন পেয়েছে। ফলে তাদের নির্বাচনী মাঠে বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। বাকি ৩৮টি দলের কেউ কেউ অতীতে নির্বাচনে অংশ নিলেও ভোটার প্রভাব ছিল সীমিত। অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে কেবল বিএনপি ও জাতীয় পার্টির এককভাবে সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। জামায়াতে ইসলামী একবার জোট সরকারের অংশ ছিল। এই তিনটি দলেরই তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠিত ভোটব্যাংক রয়েছে।
অন্য দলগুলোর ক্ষেত্রে সমর্থন মূলত ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ। এর ফল হিসেবে অনেক দল ৩০০ আসনে প্রার্থী দিতে পারেনি। নির্বাচনে অংশ নেওয়া ২৯টি দল মাত্র ১ থেকে ২০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ১০০টির বেশি আসনে প্রার্থী দিতে পেরেছে মাত্র পাঁচটি দল।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান মনে করেন, বাস্তব চিত্র অনুযায়ী এবারের নির্বাচনে মূল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন দুই জোটের মধ্যে। তার মতে, ভোটার উপস্থিতি ভালো হলে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে ওঠা প্রশ্ন অনেকটাই গুরুত্ব হারাবে।
ভোটার উপস্থিতি ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা
ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষ থেকে এখনো দৃশ্যমান কোনো বড় উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। কমিশন বর্তমানে প্রার্থিতা–সংক্রান্ত আপিল নিষ্পত্তিতে ব্যস্ত থাকায় আলাদা ভোটার সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করা হয়নি। তবে অন্তর্বর্তী সরকার সারাদেশে ‘ভোটের গাড়ি’ নামিয়ে প্রচার চালাচ্ছে। সরকারের মূল বার্তা গণভোটকেন্দ্রিক।
ইসি’র ধারণা, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থেই ভোটারদের কেন্দ্রে আনবে। ফলে বড় আকারের ভোটার উপস্থিতি ঘটবে। অতীত ১২টি জাতীয় নির্বাচনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোটার টার্নআউটের প্রধান চালিকাশক্তি রাজনৈতিক দলগুলোই। শক্তিশালী কোনো দল নির্বাচনের বাইরে থাকলে সাধারণত ভোটার উপস্থিতি কমে যায়।
এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। ফলে তাদের একনিষ্ঠ কর্মীদের একটি অংশ ভোটে না আসতে পারে। তবে আওয়ামী লীগের পদধারী নন—এমন অনেক সমর্থক নিজেদের ভবিষ্যৎ, ব্যবসা ও পারিবারিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে ভোট দিতে যেতে পারেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই ভোট কোনো একক দলে যাবে না; বরং আসনভিত্তিক বাস্তবতা দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন ভোটাররা।
জাতীয় পার্টি ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বিতর্ক
এবারের নির্বাচন কতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন মানে সব দলের অংশগ্রহণ নয়; বরং সব মতের মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা। সে হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রতীক না থাকলেও দলটির আদর্শের প্রতিনিধিত্বকারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা উচিত ছিল—এমন মত রয়েছে।
অন্যদিকে জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে রাখার বিরোধিতা করে কয়েকটি দল নির্বাচন কমিশনে আপত্তি জানিয়েছে এবং আদালতে রিটও করেছে। তাদের অভিযোগ, জাতীয় পার্টি ফ্যাসিবাদের দোসর। তবে সরকারের অবস্থান হলো—জাতীয় পার্টির নির্বাচনে অংশগ্রহণে আইনি বাধা নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ মনে করেন, এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। তবে জাতীয় পার্টি ভোটে থাকলে নির্বাচন আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে এবং গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। তার মতে, অতীতের তুলনায় এবার তুলনামূলক ভালো নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সমঝোতার আশঙ্কা ও রাজনৈতিক শঙ্কা
৫ আগস্ট–পরবর্তী সময়ে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠা কিছু রাজনৈতিক দলের ধারণা, জাতীয় পার্টি নির্বাচনে থাকলে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের একটি অংশ সেখানে আশ্রয় নিতে পারে। সে কারণে জাতীয় পার্টিকে নানাভাবে চাপে রাখার চেষ্টা চলছে। কোথাও আইনি পথে, কোথাও প্রার্থীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নির্বাচন থেকে সরে যেতে বাধ্য করার আশঙ্কাও করছেন তারা।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, আওয়ামী লীগ বাইরে থাকলে এবং জাতীয় পার্টিকেও যদি কোণঠাসা করা যায়, তাহলে জুলাই আন্দোলনের সুবিধাভোগীদের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগির পথ তৈরি হতে পারে। বাইরে প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র থাকলেও ভেতরে ভেতরে সমঝোতার নির্বাচনের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ভোটার সংখ্যা ও তরুণদের ভূমিকা
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী ভোটার রয়েছেন ৫ কোটি ৫৬ লাখ ৫৩ হাজার ১৭৬ জন, যা মোট ভোটারের ৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশাল তরুণ ভোটারগোষ্ঠী নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অনেকেই এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন, ফলে আগ্রহও তুলনামূলক বেশি।
এ ছাড়া এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮২ জন। এর মধ্যে প্রবাসী ভোটার প্রায় ৭ লাখ ৭২ হাজার এবং দেশের ভেতরে সরকারি কর্মচারী, নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ও আইনি হেফাজতে থাকা ভোটার মিলিয়ে নিবন্ধন করেছেন প্রায় ৭ লাখ ৬১ হাজার জন। এটি মোট ভোটারের প্রায় ১ দশমিক ২০ শতাংশ।
অতীতের অভিজ্ঞতা ও বর্তমান বাস্তবতা
বাংলাদেশের সর্বশেষ ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচন। সে সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ছিল প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছিল প্রায় ৪৮ শতাংশ ভোট, আর বিএনপি–জামায়াত জোট পেয়েছিল ৩৩ শতাংশ।
এর আগে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট পেয়েছিল ৪০ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৪০ দশমিক ১৩ শতাংশ ভোট। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনগুলোতেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোটের হার ছিল ৩০ থেকে ৩৭ শতাংশের মধ্যে। জামায়াত ও জাতীয় পার্টির ভোট ছিল গড়ে ১০ থেকে ১২ শতাংশ, তবে এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার মতো শক্তি তাদের কখনোই ছিল না।
ভোটারদের অনাস্থা
তবে ভোটারদের মধ্যে অনাস্থাও স্পষ্ট। শামীম শিকদার নামে ৪০ বছরের বেশি বয়সী এক ভোটার বলেন, তিনি এবার ভোট দিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেননি। তার মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কার্যক্রম দেখে ফলাফল অনেকটাই অনুমেয়। তাই ভোটের দিন ঝুঁকি নেওয়ার প্রয়োজন দেখছেন না তিনি।
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এমন এক বাস্তবতায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেমন আছে, তেমনি আছে অনাস্থা, আশঙ্কা ও প্রশ্ন। এই নির্বাচন কতটা বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে ভোটার উপস্থিতি, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণের ওপর।